Category Archives: Flash Fiction

লোকটা (অণুগল্প ১০)

লোকটা গড়গড় করে আমার নেম প্লেটটা পড়ছিল। বেশ উঁচু গলায়।  নাম, আমার পেশার খবর, ঠিকানা। পড়া হয়ে গেলে একটু দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে পাশের বাড়িতে গিয়ে আবার নেম প্লেটের সামনে দাঁড়াল। আমিও রাস্তায় নেমে এসে  তাকে দেখতে লাগলাম। শুনতে পেলাম সেখানেও নেম প্লেট পড়ছে। অনুপম নাগ। বিএ এ, বি এল, অ্যাডভোকেট, কলকাতা হাই কোর্ট। ৩৪/১ এগডালিয়া রোড। আবার বেশ জোরে জোরে। এত ভোরে আমার মত অনুপম বাবুরও কি ঘুম ভাঙাল?

আমিই কথা বললাম। এই যে, শুনছেন? সে চমকে ঘুরে আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল।

আমি বললাম — কী চান আপনি?

— আমি কিছু চাইব কেন? আপনিই তো চাইছেন।

— আমি চাইছি? আমি আবার কী চাইলাম।

— কেন? এই তো জানতে চাইলেন আমি কী চাই?

কথাটা ঠিক।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আমার দিকে। একটু পিছু হটে এলাম গেটের ভিতরে। যদি গুণ্ডা টুণ্ডা হয়। মারতে পারে। কিন্তু সেসব কিছু করল না। কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল — আপনি কে? আমি আমার নামটা বললাম। শুনে তাড়াতাড়ি সে গিয়ে আমার নেম প্লেটখানা আবার দেখল। আপনি তো এই নেম প্লেটের নাম বলছেন।

— হ্যাঁ, তাই তো বলছি।

একটা অদ্ভুত অবিশ্বাসের হাসিতে তার মুখ ভরে গেল। তারপর বলল — ওটা তো আমি। এত মিথ্যে কথা বলেন কেন বলুন তো?

— কী মিথ্যে কথা বললাম?

— এই তো একটু আগে বললেন আপনি কিছু চান নি। এদিকে চেয়েছেন। এখন নাম ভাঁড়াচ্ছেন। বুড়ো বয়েসে লজ্জা নেই।

চটে গিয়ে আমি বললাম — মিথ্যে কথা তো আপনি বলছেন। আমার নামটা বলছেন আপনার।

লোকটা অট্টহাসি করে উঠল।

— হাঃ হাঃ হাঃ … এরপর তো বলবেন অনুপম নাগও আপনারই নাম ।

— তা কেন বলব? সে তো পাশের বাড়ির লোকের নাম?

লোকটা কেমন যেন ঘাবড়ে গেল।

— অনুপম নাগ তো আমার নাম। ঐ বাড়িতেও একই কর্ম চলছে? এতো দেখছি জোচ্চোরে ভরা একটা পাড়া। এরপর হয়তো বলবেন উলটো দিকের ভবতোষ পালও ঐ বাড়ির লোকটার নাম।

— বলবই তো। ভবতোষ বাবুকে তো চিনি। উলটো দিকের বাড়িতে থাকেন।

— কী? এত বড় আস্পর্ধা! আমি ভবতোষ পাল আপনার উলটো দিকের বাড়িতে থাকি?

লোকটা বলে চলে।

— রোজ এসে দেখি প্রত্যেকটা লোক বাড়িতে আমার নেম প্লেট লাগিয়ে রেখেছে। কেউ বাদ যায় নি। এতদিন কিছু বলি নি। এবার …

ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি বললাম — এবার কী?

— ব্যবস্থা নেব, ব্যবস্থা …

— কীসের আবার ব্যবস্থা নেবেন?

লোকটা কোনও জবাব দিল না। আমিই আবার বললাম।

— আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো?

শুনে লোকটা প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কি যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিছু না পেয়ে আমার দিকে ফিরে তাকাল।

— পেলাম না।

— কী পেলেন না?

— কী আবার? আমাকে। আপনি এত কিছু চান কেন বলুন তো?

— কোথায় থাকেন?

অগ্নিদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে বলল — থাকি না।

— এভাবে বিরক্ত করছেন কেন ভোর বেলাতে? এখন কটা বাজে জানেন?

— জানি।

— কটা বাজে?

— বাজে না।

তারপর লোকটা হন হন করে হেঁটে চলে গেল। হয়তো কাল আবার আসবে।

গবরমেন্ট – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৯)


-হ্যালো, মহাদেব বলছি…
-সে কী? কেন?
-কেন মানে? আরে আমি মহাদেব বলছি …
-আরে আমিও তাই তো জানতে চাইছি, কেন বলছেন?
-এ তো অদ্ভুত কথা। আমি মহাদেব আপনাকে কেন ফোন করছি আপনার চেয়ে ভাল কে জানে?
-বলতে পারব না, এর আগে তো ফোন করেন নি …
-ইয়ার্কি মারছেন? মহাদেব আগে আপনাকে ফোন করে নি?
-না কোনোদিনও করে নি। মহাদেব কাউকে ফোন করে বলে জানতামও না …
-মশকরা হচ্ছে? আপনি সাত দিন সময় চেয়েছিলেন, …
লাইনটা কেটে গেল, যেমন কথার মাঝখানে লাইন কেটে যাওয়ার কড়া নিয়ম আছে।
তারপর আবার ক্রিং ক্রিং ক্রিং। না ধরলেও পারতাম, কিন্তু বদভ্যাস বশত ধরলাম।
-হ্যালো … মহাদেব বলছি।
-জানি।
-বলছিলাম আপনি সাত দিন সময় চেয়েছিলেন, আমি দিয়েছি। এবার যদি ঝামেলা করেন তবে অন্য রাস্তা ধরতে হবে।
-কীসের সময় চেয়েছিলাম? আপনি তো বিপদে ফেললেন দেখছি…
-আরে আমি আপনাকে বিপদে ফেললাম না আপনি আমাকে বিপদে ফেললেন … কালকে আমার মেয়ের বিয়ে, এখন কোথায় যাব?
-আপনার মেয়ের বিয়ে? আপনার মেয়ের বিয়ে নিয়ে আমি ঝামেলা করব কেন বলুন তো? আমার বয়েস ছিয়াশি। আশ্চর্য ব্যাপার তো!
-অ্যাডভান্স পর্যন্ত দিয়ে রেখেছি আর এখন বলে কীনা মহাদেব কে?
বাপ রে! মহাদেব অ্যাডভান্স দিচ্ছে। ভাগ্যবান লোক আমি।
-অ্যাডভান্স??? কেন অ্যাডভান্স দিয়েছেন? আমিই বা নেব কেন? আমি কি সাপ্লায়ার নাকি?
-সাপ্লায়ারই তো।
-কীসের সাপ্লায়ার মশাই? আমি কখনও সাপ্লাই টাপ্লাই দিই নি। কী যে সব বলেন।
-আরে চারশ লোক খাবে। আপনি পান্তুয়া আর বোঁদে সাপ্লাই দেবেন বলে অ্যাডভান্স নিয়েছেন। এখন টাকা মারবার তাল কষছেন?
-পান্তুয়া!!! বোঁদে!!!!! চারশ লোকের জন্য পান্তুয়া আর বোঁদে? আমি?
-হ্যাঁ আপনি। সীতারাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। আবার কে?
-কিন্তু আমি তো সীতারাম ভাণ্ডার নই।
-আরে আপনি সীতারাম হবেন কেন? সে তো আপনার বাবা। আপনি শিবরাম না কী যেন একটা। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে … কেনারাম নস্কর। ৯৯৫৫৫ ৬৬৮৮৮। এটাই তো আপনার নম্বর।
-না।
-না? না মানে?
-না মানে না। আমার নম্বর ৯৯৫৫৫ ৮৮৬৬৬।
একটু চুপ। তারপর …
-তাই নাকি? এয়ারটেল তো?
-সেরকমই তো শুনেছি।
-আগে বলবেন তো? মিছিমিছি সময় নষ্ট করছেন কেন আমার? ফালতু পার্টি কোথাকার!
-আজ্ঞে আপনি তো পান্তুয়া আর বোঁদে চাইছিলেন, নম্বর তো চান নি।
-দূর, গাধার বাচ্চা!
একবার সীতারামের বাচ্চা বলে, একবার বলে গাধার বাচ্চা।
-সময় নষ্ট করে দিল। উজবুক কোথাকার। ডেকরেটরটারটাও আসেনি। যত দিন যাচ্ছে লোকজনের বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। হবে না – যা গবরমেন্ট! যতোস্‌সব। ধ্যাত্তেরি!
লাইন কেটে গেল।

 

ধুউউশ্‌’শাআআলা — ফোনুগল্প (অণুগল্প ৮)


– হ্যালো!
– হ্যালো! উচ্চগ্রামে।
– হ্যা—লো–ওওও …
– হ্যা—লো—ওওওওও …। আরও উচ্চগ্রামে।
– ধুঃ—শালা। কেটে গেল।
– ক্রিইং ক্রিইং –
– হ্যালোওওও – হ্যাঁ, এতবার তো হ্যালো হ্যালো বললাম – তুই তো শালা জবাবই দিলি না –
– জবাব দিলাম না মানে? আমি তো কতবার বললাম …
– কী বললি? – হ্যালো – হ্যালো – শুনতে পাচ্ছিস? – হ্যাঁ – কী বললি? –
– কী আবার বলব? – হ্যালো হ্যালো বললাম … তুই তো শালা চুপ করে রইলি … তারপর লাইন কেটে দিলি … হ্যালোওওও … শুনতে পাচ্ছিস? … কী বললি? … লাইন কাটিস নি? … হ্যালো হ্যালোওওও …
– ধুঃউউউশ্‌’শালা, আবার কেটে গেল …
– ক্রিইং ক্রিইং –
– হ্যালোওওও – হ্যাঁ হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি বেশ পরিষ্কার এবার – কী? হাবুলের ফোন নাম্বার? হ্যাঁ, আছে তো। দাঁড়া তোকে ওয়াট্’স অ্যাপ করে দিচ্ছি। কেন, ওয়াট্‌’স অ্যাপ করব না কেন? তোদের ইন্টারনেট চলছে না? এস্ এম্‌ এস্‌? কাজ করে না? ও আচ্ছা, দাঁড়া, দাঁড়া, একটু খুঁজে নিয়ে বলছি। … হ্যাঁ পেয়েছি … লিখে নে … ৯৯৪৩ … কী বললি? … আরও জোরে বলব? ঠিক আছে … ৯৯৪ … আরে এর চেয়ে জোরে বলব কী করে? গলায় চিড় ধরবে তো … কেন শুনতে পাচ্ছিস না ভাল করে? তোর কানে গণ্ডগোল হয়েছে … অ্যাঁ … বাসের আওয়াজ? … শোনা যায় না … কী? … বাসের আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যায় না তোদের পাড়ায়? … ঠিক আছে … তবে নয় রাতে ফোন করব … হ্যালোওওও … ধুউউউশ্‌শালা … আবার কেটে গেল …

রাত এগারোটার পর।

– হ্যালোওও …
– হ্যাঁ বল্‌ — শুনতে পাচ্ছি …
– তাড়াতাড়ি লেখ্‌ … ৯৯ … কী বললি? শুনতে পাচ্ছিস্‌ না? আরে রাত দুপুরে এমন গলা ফাটিয়ে ফোন নম্বর বলতে হলে তো পুলিশ ধরবে … আর কত চেঁচাব? এখনও বাস যাচ্ছে নাকি? যাচ্ছে না … তাহলে তো তুই কালা বলব … কী? কী বললি? কুকুর? কুকু—র? তাড়া করেছে? করে নি? তবে? চেঁচাচ্ছে? দশটা কুকুর? রাস্তার কুকুর? তোর বাড়িতে দশটা রাস্তার কুকুর কী করছে? বাড়িতে না? রাস্তায়? কুকুররা কুকুর দেখলে খেপে যায়? সব তোর বাড়ির সামনে? কর্পোরেশনে খবর দে না, ধরে নিয়ে যাবে। কী বললি? তোকেও ধরে নিয়ে যাবে? নতুন আইন? তাহলে কী করব? ফোন রেখে দেব? কী বললি? কী বললি? … ধুউউউশ্‌’শাআআলা … লাইন কেটে গেল …

সবুজ শাড়ি — অণুগল্প ৭


ভদ্রমহিলা বারবার বলছেন – আমি যাব, আমি যাব।

ব্যাঙ্কে পাসবুক আপ-টু-ডেট করার মেশিনের লম্বা লাইনের পাশটিতে দাঁড়িয়ে। এক ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন – লাইনে দাঁড়ান। দেখছেন না লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সবাই।

শুনেও মহিলা বললেন – আমি যাব, আমি যাব।

আমি লাইনেই দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে। ফলে তখন প্রায় মেশিনের ধরা ছোঁওয়ার মধ্যে এসে গিয়েছি। আমার আগের ভদ্রলোকের কাজ শেষ হয়ে যেতেই আমার পালা এল।

এদিকে আবারও সেই আমি যাব, আমি যাব।

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে মহিলাকে দেখলাম। বয়স্কা। জিজ্ঞেস করলাম – আপনি কি আমার আগে যেতে চাইছেন?

এক গাল হেসে উনি মাথা দুলিয়ে জানালেন তেমনটাই তাঁর ইচ্ছে।

তারপর বললেন – অনেক বয়েস তো, দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। কষ্ট হয়।

আমি বললাম – ঠিক আছে আপনিই আগে চলে আসুন। আমার বয়েস কিন্তু আপনার সমান বা তার চেয়েও বেশি।

অসীম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উনি বললেন – ধ্যুৎ! আমি অনেক বড়।

আমি আবারও বললাম – হতেই পারে না।

উনি বললেন – কেন পারে না? আমার বয়েস ৮৮।

একটু চমকে উঠলাম। ঠিকই বলেছেন। বেশ খানিকটা বড়। ওনার শাড়ির রঙটা সবুজ। তাই হয়তো ভুল করলাম। এক জ্যোতিষি বলেছিল অতদিন আমি নাকি বাঁচবই না। এইসব ভাবছি, এমন সময় মহিলা বললেন – আমি তো এইসব মেশিন দিয়ে কিছু করতেই পারি না। আপনি করে দিন। বলে পাসবুকটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন নিশ্চিন্তে।

কী মুশকিল। কেন যে পরোপকার করতে গেলাম? সবুজ শাড়িটা যত অনর্থের মূল। ওনার পাসবুক যন্ত্রস্থ করে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেশিন নিজের মনে কী সব গজগজ করে হঠাৎ খাতাটা উগরে বের করে দিল। মহিলা আমার কর্মক্ষমতার উপর পরম বিশ্বাসে তখনও সবুজ শাড়িতে শোভা পাচ্ছেন। এদিকে আমি দেখি মেশিন লিখিত ভাবে ঘোষণা করছে – বার-কোড মিলছে না। আপ-ডেট করা সম্ভব না।

খাতাটা বের করে উলটে পালটে দেখলাম বার-কোড লাগানোই নেই।

বললাম – এ কী? বার-কোড লাগানো নেই তো। তাহলে যন্ত্র তো আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করবে না।

সবুজ শাড়ি বললেন – তাই? বার-কোড কী? একদম অসহায় চাহনি। মনটা খারাপ লাগল। ওনার হয়ে এই কাজটা করার জন্য ছেলে মেয়ে জাতীয় কেউ নেই নিশ্চয়ই। হয়তো ছিল, মরে গিয়েছে। মানে হয়তো আমেরিকাতে থাকে। কিংবা অস্ট্রেলিয়া। কিংবা ফিনল্যান্ড।

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম ওনার ছেলেপুলেরা মরে গিয়েছে কীনা। করলাম না। তার বদলে আঙুল দেখিয়ে বললাম – দেখুন তো, ঐ কাউন্টারটায় বোধহয় ওরা বার-কোড লাগিয়ে দেবে। নিজের পাসবুকটাও ওনাকে দেখালাম, বার-কোড কাকে বলে চেনাবার জন্য। ওনার মৃত ছেলে মেয়েরা এই কাজটা করে যায় নি মনে হল। উনি আর কিছু বললেন না। আস্তে আস্তে কাউন্টারের খোঁজে চলে গেলেন।

একটু অপরাধ বোধ যে হল তা স্বীকার করতেই হয়। আমিও তো সঙ্গে যেতে পারতাম। কিন্তু এও ভাবলাম — কত সন্তানহারাকে বার-কোড বোঝাব?

স্বার্থপরের মত নিজের কাজটুকু করে বেরিয়ে এলাম। নিজের কাজ তো হল, কিন্তু মনটা কেবল খোঁচা মারছে। ওনার ছেলে মেয়ে তো সেই কবেই চলে গিয়েছে। হয়তো ওদের শেষ দেখেছেন ১৯ বছর আগে। এয়ারপোর্টে বাই বাই করার সময়। কেমন দেখতে তাই কি আর মনে করতে পারবেন?

কী যে করি! সারাক্ষণ কানে বাজছে — আমি যাব, আমি যাব।

পরণে সবুজ শাড়ি, বয়েস ৮৮।

লাইফ – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৬)

— হ্যালো! নারীকণ্ঠ, বিরক্তিপূর্ণ।
— হ্যালোও। আমি, একটু ঘাবড়ে।
— আচ্ছা, আপনি কী চান ঠিক করে বলুন তো…
সকালে একবার জিলিপি খেতে ইচ্ছে করেছিল। রোজই করে। এ ছাড়া আর তো কিছু চাই নি। জিলিপির দোকান আজকাল ফোন করে? কে জানে? সুইগির যুগ।
— আজ্ঞে, আজ তো জিলিপি চাই নি।
— কী চ্যাংড়ামো করছেন!
— তা কেন করব? চাই নি, সত্যিই চাই নি। কোনো কিছুই চাই নি।
— চান নি? কিছুই চান নি? বিরক্তি থেকে উষ্মার দিকে।
— না তো … । দুশ্চিন্তায় আমি।
— তাই বুঝি? তবে রোজ এসব করছেন কেন?
মেয়ে পুলিশ না তো? ভাবনায় ঘামতে শুরু করি।
— রোজ কী করছি ম্যাডাম?
— কী করছেন? আবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে?
গা ছমছম করে ওঠে।
— কী, জবাব দিচ্ছেন না কেন?
মনে হল বন্দুকটা আমারই দিকে টিপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
— কেমন করে জবাব দেব ম্যাডাম? আপনার কথা তো বুঝতেই পারছি না।
— ন্যাকা তাই না? বুঝতে পারছেন না? রোজ মেসেজ পাঠাচ্ছেন কেন? এই ওয়ান টু দিয়ে শেষ নম্বরে …
— দেখুন মেসেজ তো পাঠাই অনেক। কিন্তু ওয়ান টু নম্বরে কী পাঠালাম মনে করতে পারছি না।
ওপাশে আরও কয়েকটি নারীকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। ফোনের নারীকণ্ঠ অন্যদের বলছে শুনলাম।
— এই দেখ্ তো, জানতে চাইছে কী মেসেজ করেছে।
— হ্যালোওওও … আপনি রোজ মেসেজ করছেন আর বলছেন কী মেসেজ জানেন না!! আরেকটি গলা।
— আজ্ঞে তাইতো বলছি। ভয়ে গলা একটু কাঁপে।
— আপনি কোথা থেকে বলছেন? খুব রেগেছে।
— আমি কোথা থেকে আর বলব ম্যাডাম? আপনার বন্ধুই তো কোথা থেকে বলতে শুরু করলেন। আমি নাকি মেসেজ করি। কী মেসেজ একটু বোঝাবেন …?
— কী মেসেজ? একটাই তো মেসেজ। আপনি লাইফ চান …
— লাইফ চাই? তার মানে কী?
জিলিপি না তাহলে। সন্দেশ, জিলিপি, পান্তুয়া, কিছুই না? হায় হায়।
— রোজ বলছেন লাইফ চান, আর এখন বলছেন মানে জানেন না?
— দেখুন, সত্যিই জানি না। আপনি কি এল আই সি থেকে বলছেন?
— কী? রেগে আগুন, তেলে বেগুন।
— মানে লাইফ ইন্সিওরেন্স কর্পোরেশন থেকে বলছেন?
— আবার বাজে বকছেন?
— আমি লাইফ ইন্সিওরেন্সের কথা বলছি। রাত সাড়ে নটায় এল আই সি তো ফোন করে না। তাছাড়া আমার বয়েস আশি পেরিয়েছে। ও লাইফ আর ইন্সিওর করে কী লাভ? আমার গলায় এবার আত্মবিশ্বাস।
আর ওদিকে যেন একটু যেন অস্বস্তি।
— আপনি লাইফ চেয়ে চেয়ে ওয়ান টু-তে ফোন করছেন আর এখন …
— ম্যাডাম, লাইফ আমাকে চায় না। আমি আর লাইফকে চেয়ে কী করব বলুন? তবে জিলিপি এখনও দিব্যি চাই।
লাইন কেটে গেল। কোনোমতে লাইফ কাটাচ্ছি। না চেয়েই। দেখি কতদিন চলে!

পার্সোনালিটি – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৫)

আমাকে কেউ ফোন টোন করে না। তাই আমিও করি না। কিন্তু মাসের শেষে ফোনের বিল দিই। কেন কে জানে? বিমর্ষ লাগে। মাঝে মধ্যে অবশ্য ফোন বেজে উঠে হর্ষ জাগায়। আমি উৎসাহে লাফিয়ে উঠি।

–হ্যালোওওও।

অপর দিক থেকে পুরুষ বা নারী কণ্ঠ শোনা যায়।

— কে কানাই ড্রাইভার? কাল আসবি বলে এলি না কেন?

বুঝি এ ফোন আমার নয়। তবু জবাব দিই।

–মিথ্যে কথা বলেছিলাম। তুই বরং চলে আয়।

কণ্ঠস্বর চমকে ওঠে।

–মাল খেয়েছিস নাকি বেটা? সাহস তো কম না। তুই বলছিস!

আমি ফোন রেখে দিই।

আরেক জাতীয় ফোন আসে। নারী কণ্ঠ। আজই এসেছিল। সে আর হ্যালো বলল না।

–মিস্টার দীপংকর? আমি এয়ারটেল থেকে বলছি। আপনার জন্য একটা দারুণ অফার আছে মিস্টার দীপংকর।

এই মিস্টার দীপংকর সম্বোধনটার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। উত্তর ভারতে অনেকে মিস্টার গুপ্তা বলতেন। তাঁরা ভাবতেন ভগবানদাসের মত আমার নাম দীপংকরদাস আর পদবী গুপ্তা। বহু বুঝিয়েও তাদের দাশগুপ্ত ব্যাপারটা বোঝাতে পারি নি। কিন্তু মিস্টার দীপংকরটা নতুন ঠেকল।

–তাই বুঝি? কী অফার, আরেকটা সিম কার্ড?

— না, না, মিস্টার দীপংকর। আপনি আমাদের অনেকদিনের কাস্টোমার, তাই আপনাকে একদম ফ্রি-তে একটা স্পেশাল অফার দেওয়া হচ্ছে।

–তাই? একটু খোলসা করে বলবেন?

–অবশ্যই বুঝিয়ে দেব মিস্টার দীপংকর। এটা থাকলে আপনাকে যে ফোন করবে সে কোনও ক্রিং ক্রিং শুনবে না।

আঁতকে উঠলাম।

–সে কী? কিছু না শুনলে তো মুশকিল হবে। অবশ্য কানাই ড্রাইভারের খোঁজ করলে অন্য কথা।
–কী বললেন মিস্টার দীপংকর? কানাই? আপনি মিস্টার কানাই?

–না না, আমি কানাই না। সে অন্য লোক।

নারী কণ্ঠে খুশি উপচে পড়ে।

–মিস্টার দীপংকর, এই অফার নিলে যিনি আপনাকে ফোন করবেন তিনি শুনবেন “হ্যালো, আমি মিস্টার দীপংকর বলছি”! আর সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এটা আপনি যেকোনো ভাষায় শোনাতে পারবেন। কেবল বছরে একবার মাত্র ৩০০ টাকা দিতে হবে।

বিনা মূল্যের মূল্য ৩০০ টাকা।

তবু একটু ভাবলাম। আইডিয়াটা মন্দ নয়। কানাই ড্রাইভারের হয়ে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। তবে সে লোকটাকে এত শত কথা বলব কেন? জানতে চাইলাম।

–এমন হলে আমার সুবিধা কী?

–মিস্টার দীপংকর, কলারের কাছে আপনার পার্সোনালিটি দারুণ বেড়ে যাবে।

মেয়েটির গলায় উত্তেজনা।

–সে কী? আমার ফোন এই অদ্ভুত উপায়ে আমার পার্সোনালিটি বাড়িয়ে দেবে?

–হ্যাঁ মিস্টার দীপংকর, যে শুনবে সেই ইম্‌প্রেস্‌ড হবে।

–তাই নাকি? আচ্ছা আপনি নিজে একবার শুনে দেখুন তো। আমি মিস্টার দীপংকর বলছি। আপনি কি ইম্‌প্রেস্‌ড হয়ে গেলেন এটা শুনে?

–না, মানে আমি তো এয়ারটেল থেকে বলছি।

–না? আপনি না বললেন? ইম্‌প্রেস্‌ড হলেন না?

–না। মানে হ্যাঁ, মানে ঐ আর কী! আসলে আমি তো কোম্পানি থেকে বলছি।

–তাই তো জিজ্ঞেস করছি। আপনি ইম্‌প্রেস্‌ড হয়েছেন কি? এটা জানা খুব জরুরি। এয়ারটেল ছাড়া আর কেউই প্রায় আমাকে ফোন করে না। এয়ারটেল নিজেই ইম্‌প্রেস্‌ড না হলে ৩০০ টাকা দেব কেন?

–মিস্টার দীপংকর! এয়ারটেল তো কোম্পানি।

–আর আপনি? আপনি কী? মানুষ না কোম্পানি? আমি জানতে চাই আপনি আমার পার্সোনালিটির ব্যাপারে ইম্‌প্রেস্‌ড হয়েছেন না হন নি। আমি মিস্টার দীপংকর বলছি।

বেচারা মেয়েটা, দু-চারটে পার্টি ধরে দিতে পারলে কমিশন পাবে। একটু কষ্টই হল।

–দেখুন, আমি যাকে বলে বেশ পাঁচু টাইপের একটা লোক। পাঁচুর ঐ পা-টুকুতেই পার্সোনালিটির সঙ্গে মিল। আমার মনে হয় আপনিও আমারই মত একটা লোক। তবে আমার পার্সোনালিটি বিহীন জীবনের আর অল্পই বাকি আছে। আপনাকে কিন্তু এখনও অনেক বছর এয়ারটেলওয়ালাদের দুর্দান্ত সব অফার নিয়ে মিস্টার দীপংকরদের পিছনে ছুটতে হতে পারে। আপনাকে কেউ ফোন টোন করে? আমাকে করে না, আপনার মত ভুল না করলে।

ঠিক আছে – ফোনুগল্প (অনুকল্প-৪)

১২১ টিপে মানব বাবু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এয়ারটেলের গান শুনলেন। তারপর ওপার থেকে ভেসে এলো এক নারীকণ্ঠ। ইংরেজিতে জানাল – যদি মানব বাবু ইংরেজিই চালিয়ে যেতে চান তবে যেন ১ নং বোতাম টেপেন। বাংলার জন্য ২, হিন্দীর জন্য ৩ ইত্যাদি। প্রায় কিছু না ভেবেই মানব বাবু ২ টিপে দিলেন। তারপর আবারও কিছুক্ষণ সঙ্গীত বিরতি। শেষে নতুন একটি নারীকণ্ঠ। বিশুদ্ধ হিন্দীতে বলল – এয়ারটেলকে ফোন করার জন্য ধন্যবাদ। কী ভাবে সাহায্য করতে পারি?

মানব বাবু হিন্দীতেই জবাব দিলেন। বললেন – ম্যাডাম আমি তো বাংলা শুনতে চেয়েছিলাম। মহিলা তৎক্ষণাৎ বললেন — অতীব দুঃখিত, এখুনি আপনাকে বাংলা ধরিয়ে দিচ্ছি। তারপর আবার সংগীত মুখর বিরতি। মিনিট কয়েক পরে এক পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল। সেই একই কথা। কেমন করে আপনাকে সাহায্য করে এয়ারটেল ধন্য হতে পারে?

মানব বাবু বললেন – দেখুন আপনারা আমাকে এক অন্য ব্যক্তির বিল পাঠিয়েছেন। এ নম্বর আমার কোনোকালে ছিল না। ৩০ হাজার টাকার বিল আমার হওয়া সম্ভব না।

পুরুষ – দয়া করে আপনার ঠিকানা ও ইমেল আই ডি জানাবেন কি?

মানববাবু – অবশ্যই। অমুক, তমুক …

পুরুষ – অনেক ধন্যবাদ। অনুগ্রহ করে একটু ধরুন। আমাদের সিস্টেম থেকে সব জেনে দিচ্ছি।

মানববাবু ধরে রইলেন। এবার প্রায় মিনিট সাত আট। পুরুষ ফিরে এলো।

পুরুষ – আপনাকে জানাতে চাইব যে … । এটুকু বলার পর পুরুষ কণ্ঠ কী বলল মানব বাবু বুঝলেন না। কেবল শেষ শব্দ দুটো বুঝলেন – ঠিক ক আছে? অতি দ্রুত গতিতে।

মানববাবু বললেন – দেখুন একটু ধীরে না বললে তো বুঝব না। বয়স হয়েছে।

পুরুষ – অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করব। তারপর আবার সুপারসনিক গতিবেগে পুরুষ বলল – হিজিবিজিহিজিবিজিহিজিবিজিহিজিবিজি, ঠিক আছে? হিজিবিজিহিজিবিজিহিজিবিজি ঠিক আছে?

মানুববাবু বাধ্য হয়েই বললেন – না স্যর ঠিক নেই। আপনার বক্তব্যের ঐ ঠিক আছে-টুকুই বুঝেছি। বাকি কিছুই বুঝলাম না। এটাও বুঝেছি যে আপনি জানাতে চাইবেন, কিন্তু জানাতে চান কীনা পরিষ্কার হল না। একটু যদি খোলসা করে ঢিমে তালে বলেন বড় সুবিধা হয়।

পুরুষ – অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করব। হিজিবিজিহিজিবিজিহিজিবিজি ঠিক আছে? হিজিবিজিহিজিবি ঠিক আছে?

মানববাবু ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন – দেখুন আমি ২ টিপেছিলাম। কিন্তু আপনি তো বাংলা বলছেন না।যে ভাষা বলছেন সে তো আমি …

কথা শেষ করতে না দিয়ে পুরুষ আবার বলে উঠল – নিশ্চয়ই, আপনাকে অতি অবশ্য সাহায্য করব। হিজিবিজিহিজিবিজিহিজিবিজি ঠিক আছে?

তারপর আর মানববাবুর বক্তব্য শোনার অপেক্ষা না করে পুরুষ বলল — হিজিবিজিহিজিবিজিবিজি … এয়ারটেলকে ফোন করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনার দিনটি শুভ হোক।

ফোন কেটে গেল।

মানববাবু কাঁদ কাঁদ হয়ে বললেন – ঠিক আছে।

***
***

টা টা (অণুগল্প ৩)

সন্ধে হব হব। লোকজন কম। রাস্তাটা ক্রস করতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। খালি গায়ে, ছেঁড়া লুঙ্গি পরনে, এক মুখ খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি ওয়ালা একটা লোক বাসের ওপাশ থেকে হুঙ্কার দিয়ে বেরিয়ে এল। দেখি থান ইট হাতে আমারই দিকে তাক করছে। জীবনে কখনও এত চমকাই নি।

– অ্যাই! কোথায় যাচ্ছিস? মাথা ফাটিয়ে দেব। এক পাও এগোবি না। লজ্জা করে না? হিন্দু না মুসলমান?

ভয়ে রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে ফিরে এলাম। লোকটাও পিছু পিছু এসে পাশেই দাঁড়াল। ফাঁকা রাস্তা। যেদিকেই তাকাতে যাই লোকটা মারতে আসে। – ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? পাকিস্তান? পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেব। একটা বিড়ি দে।

– বিড়ি কোথায় পাব?

লোকটা আবার থান ইটটা বাগিয়ে এল। আমি ভয়ে ভয়ে পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে ওকে দিলাম। -দশ টাকায় কী হবে? আরও দে শালা। আড় চোখে থান ইটটা দেখতে দেখতে একটা কুড়ি টাকার নোট দিলাম।

-ধ্যাত্তেরি। পাঁচ শ ছাড়, নইলে মাথার খুলিতে থান ইট ভরে বাড়ি ফিরবি।

– পাঁচ শ…. কোথায় পাব?

লোকটার চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরাচ্ছে। কুড়িয়ে বাড়িয়ে তিন শ একাত্তর টাকা বেরোল। জিভে আঙুল ভিজিয়ে দু হাতে ভাল করে গুণে নিল লোকটা। থান ইটটা আমারই হাতে ধরিয়ে দিয়ে। তারপর ধমকে বলল – জামাটা খুলে দে, দেখছিস না খালি গা। যদিও থান ইটটা আমারই হাতে, তবুও কাঁপতে কাঁপতে শার্টটা খুলে ওকে দিলাম।

কিছুক্ষণ আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বলল – ঠিক আছে, ওতেই হবে। প্যান্টটা কাল নেব।

তারপর ফিক করে হেসে বলল – ইটটা বরং রেখেই দিন স্যর। যে অবস্বায় আছেন, কাজে লাগতে পারে। নইলে প্যান্টটাও থাকবে না। চলি, টা টা।

***

***

অনুপমা – ফোনুগল্প (অণুগল্প ২)

-হ্যালো …
-হ্যাঁ, বলুন …
-স্যর আপনি তো আকোয়া গার্ডের জিনিস ব্যবহার করেন।
কণ্ঠস্বর বলছে মেয়েটার বয়স খুব বেশি হলে পঁচিশ। কেমন দেখতে কে জানে।ছিপছিপে লম্বা গড়ন? নাকি বেঁটে মোটা, গোলগাল।
-হ্যাঁ করি।
-আপনি কি অমুক তমুকগুলো ব্যবহার করছেন?
-ঠিক বুঝতে পারলাম না। আরেকবার বলবেন? কী জিনিসের কথা বলছেন? আমি আপনাদের ভ্যাক্যুওম ক্লিনার ব্যবহার করি, ওয়াটার পিউরিফায়ার ব্যবহার করি, একটা এয়ার পিউরিফায়ার না কী যেন কিনিয়েছিলেন, সেটাও ব্যবহার করতাম। এখন অনেকদিন করিনি। তাই আর তো কিছু কেনার নেই।
-না, না। ওগুলোর কথা বলছি না।
তার গলায় এবার স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
-আমি অন্য জিনিসের কথা বলছি।
-কী জিনিস?
-সিসি-টিভি আছে কি আপনার? একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে গিয়ে আপনাকে ডেমন্সট্রেশন দিয়ে আসতে পারি।
-না, না।
এবার উৎকণ্ঠা আমার কণ্ঠস্বরে।
-আমি সিসি-টিভি দিয়ে কাকে দেখব? আমার মিসেস্‌ টিভি সিরিয়াল দেখেন, আর আমি অন্য ঘরে বসে দুশ্চিন্তা করি। আমাদের দুজনের কেউই কাউকে দেখতে পাই না। মানে চাই না। সিসি-টিভি দিয়ে নতুন কী দেখব?
-স্যর সিকিওরিটির জন্য এগুলো কাজে লাগে। আপনি একটা দিন দিলে আমাদের ইঞ্জিনিয়র গিয়ে দেখিয়ে দেবে।
পঁচিশ বছরের মেয়েটা নিজে আসবে না। কালো ব্যাগ কাঁধে ইঞ্জিনিয়র পাঠাবে।
-ও, আপনি নিজে আসবেন না? তাহলে তো …
আর কিছু বললাম না।
-না স্যর, ইঞ্জিনিয়র যাবে। সব বুঝিয়ে দেবে। এটা রাখা খুব জরুরি। আপনি একবার ট্রাই করে দেখুন।
-আচ্ছা আপনি কেন বুঝছেন না যে আমার কাউকে দেখার নেই। আর এমন কোনও লোক নেই যে আমাকে দেখতে চায়! তবে হ্যাঁ, একটা ইঁদুর আমার বাড়িতে কদিন ধরে বাসা বেঁধেছে। হয়তো কাচ্চা বাচ্চাও হয়েছে প্রচুর। ঐ ইঁদুরটাকে কি সিসি-টিভি দিয়ে খুঁজে পাব?
-হ্যাঁ স্যর পাবেন। ইঁদুর, আরশোলা, টিকটিকি সব ধরা পড়বে।
মেয়েটির গলায় উৎসাহ উথলে পড়ছে।
-তারপর?
-কি বললেন স্যর?
-বললাম, তারপর? মানে তারপর কী করব? শোবার ঘরে বসে বসার ঘরের ইঁদুর দেখব? সিসি-টিভি দিয়ে কি ইঁদুর ধরাও যায়? নাকি ইঁদুর দেখলে আপনাদের খবর দিতে হয়?
-স্যর, আপনি একবার ডেমন্সট্রেশনটা দেখুন, তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
-না গো, এখন আমার ঐ জন্তরটার দরকার নেই। দরকার হলে জানাব।
-ও! তাহলে স্যর আমার ফোন নম্বরটা সেভ করে রাখুন। আমাকে ফোন করলে ব্যবস্থা করে দেব। আমার নাম অনুপমা।
-ঠিক আছে, যেদিন দরকার হবে, সেদিন তাই করব। কিন্তু আপনি কি তখনও এই কোম্পানিতেই কাজ করবেন? হয়তো ততদিনে কানপুরে জুতোর দোকানের সেল্‌স গার্ল হয়ে গিয়েছেন।
একটু হাসি। এইটাই শুনতে চাইছিলাম। পঁচিশ বছরের মেয়ের গলার মিষ্টি হাসি। বেঁটে মোটা হলেও, ভারি মিষ্টি।
-না স্যর, আমি এখানেই থাকব। আপনি আমাকে ফোন করলেই সব ব্যবস্থা করে দেব।
এবার আমার হতাশ হাসির পালা। এমন কত ফোন নম্বর সেভ করেছি। নম্বর থেকে যায়, অনুপমারা থাকে না। ঐ পঁচিশ বছর বয়সটা খুব ডেঞ্জারাস। কেটে পড়ে।
-ঠিক আছে। আপনার নম্বর সেভ করে রাখছি। আগে আপনাকে ফোন করব। তারপর আপনাকে না পেলে আকোয়া গার্ডকে ফোন করব।
-হ্যাঁ স্যর, থ্যাঙ্ক্যু।
ইঁদুরটা ফিক ফিক করে হাসছে তো হাসছেই।

***
***
***

হয়তো (অণুগল্প ১)

বয়স অল্পই হবে। বেশি হলে ভিড়ের মিনি বাসে চড়ে অত সহজে সিট দখল করতে পারত না।

আমার ঠিক পাশেই। ঘুরে তাকিয়ে দেখার প্রবল ইচ্ছে। পারছিনা। সরাসরি পাশ ফিরে কোনও অচেনা মেয়ের দিকে তাকানো কি সভ্যতার কাজ? কেউ কেউ পারে। আমি পারি না।

চোরা দৃষ্টিতে মেয়েদের দিকে চাইলে তারা কি খুশি হয়? হয়তো হয়। কে তাকাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে বোধহয়। নিঃসন্দেহে আমি সে লোকটা নই।

জানালার ধারে বসে আছি। সূর্য পশ্চিমে, বিকেল চারটের আভা। পশ্চিমের সূর্যের আলোতে তার মুখও নিশ্চয়ই রাঙিয়ে উঠেছে।

সংযম হারিয়ে আড়চোখে টুক করে তাকালাম। সে উলটো দিকে চেয়ে। শুধু মাথার ঘন কাল চুলের বিনুনি দেখতে পেলাম। পরনে দামী শাড়ি। নীল আকাশে সাদা মেঘ। ঢাকাই? হবেও বা। মিনি বাসে দামী ঢাকাই শাড়ি? নিজের বুদ্ধির কথা ভেবে একটু হতাশই হলাম।

মুখটা সামান্য এদিকে ঘোরালেই আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতাম। কিন্তু সে নিবিষ্ট মনে অন্য দিকে কী দেখতে মগ্ন কে জানে?

হয়তো সুন্দরী। হয়তো চোখে মুখে বুদ্ধির ছাপ। হয়তো এর খোঁজেই কেটেছে চিরকাল। অজস্র প্রশ্ন। অচেনা মেয়ে, চেনা প্রশ্ন।

বাস এক্সাইড মোড় পার হয়ে পৌঁছে গেল গুরুসদয় রোডে। ভিড় কমে আসছে, নতুন যাত্রী বেশি উঠছে না। এখনই দেখার সুযোগ। মনে হল সকলেই ওকে দেখছে, কেবল আমি বঞ্চিত।

এই থামান!

কর্কশ এক কণ্ঠস্বর। হাঁড়িচাঁচার মত। আমার পাশেই। স্টপেজে না থেমেই বাসটা চলে যাচ্ছিল। জোরে ব্রেক কষে থেমে গেল। আমি প্রায় হুমড়ি খেয়ে উলটে পড়ছিলাম। কণ্ঠস্বর শুনে? নাকি বাসের ব্রেকে টাল সামলাতে না পেরে? বোধহয় দুটোই।

মেয়েটি আরও কী সব বলল কন্ডাক্টরকে। শাসনের ভঙ্গিতে। বচসা হল।

আগে বলবেন তো!

আগেই তো বলেছিলাম, আপনারা কানে শোনেন কিছু? আবার হাঁড়িচাঁচা। আর তাকাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু সে তখনও আমার দিকে পিছন ফিরে।

বাস থেকে নেমে গেল। একটু চেষ্টা করলে এবার তাকে দেখতে পারতাম ঠিকই। দেখলাম না।

হাঁড়িচাঁচাকে।

পরনে দামী শাড়ি। হয়তো।

হয়তো সুন্দরী।