Category Archives: Flash Fiction

অবৈধ — অণুগল্প

অরুণিমা — ফোন করেছিলাম সেদিন, ধরলে না … ওয়াট্‌স অ্যাপ মেসেজেরও জবাব এল না।

পলাশ – ফোন? শুনতে পাই নি তো? ওয়াট্‌স অ্যাপটাও বোধহয় কাজ করছিল না। কী জানি।

অরুণিমা — ও আধ ঘণ্টার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। সেই সুযোগে ফোন করলাম … তুমি ধরলে না। আজও একটু পরেই ফিরবে।

পলাশ – আমাকে তুমি সারা জীবনে আধ ঘণ্টার বেশি সময় দিলে না। আচ্ছা উনি আমাকে এত অপছন্দ করেন কেন? আমি তো ওনার সঙ্গে শত্রুতা করি নি। করার ইচ্ছেও নেই। একেবারেই নেই। কেমন করে শত্রুতা করা যায় তাও বুঝতে পারি না।  

অরুণিমা — হ্যাঁ … জানি … কিন্তু রেগে যায়।

পলাশ – কেন? কী বলেন?

অরুণিমা — ঐইই … অচেনা পুরুষটা তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে কেন? লোকটার মতলব খারাপ।

পলাশ — বললেই পার … অচেনা পুরুষ না, চেনা বুড়ো … কলেজে চিনতাম।

অরুণিমা — বিশ্বাস করে না।

পলাশ — সত্যি কথাটা বলে দাও। তোমাকে লাইন দিয়েছিলাম … তুমি ভাগিয়ে দিয়েছিলে … খুশি হবেন।

অরুণিমা — রোজ আমার ফোন খুলে দেখে তোমার ফোন এসেছিল কীনা।

পলাশ — বাপরে …

অরুণিমা — হি হি হি …

পলাশ — তোমার সঙ্গে যোগাযোগ না করলেই পারতাম। মানুষ ভুল করে ফেলে … জয়ন্ত তোমার ঠিকানাটা দিল, আমিও আমার নতুন বইখানা তোমাকে পাঠিয়ে দিলাম। ফোন কিন্তু করি নি।

অরুণিমা — ওয়াট্‌স অ্যাপ তো করেছিলে। এমন কথাও বলেছিলে যে আমাকে কোনোদিন ভুলতে পার নি।

পলাশ – বলেছিলাম বটে। কথাটা সত্যি।

অরুণিমা – সত্যি কথা? আমি তো এখানেই ছিলাম। যোগাযোগ কর নি কেন?

পলাশ — সে কী? তুমি তো আমাকে ফুটিয়ে দিয়েছিলে। সারা জীবনে একদিনই কথা বলেছ সামনাসামনি। মানে পাশাপাশি। তারপর আমি কলেজের গেটে ভিখিরির মত দাঁড়িয়ে থাকতাম, আর তুমি তোমার বান্ধবী পরিবেষ্টিত হয়ে পাত্তা না দিয়ে চলে যেতে। ঐ মহিলা ব্যূহ ভেদ করে তোমার সঙ্গে কথা বলা অসম্ভব করে দিয়েছিলে।

অরুণিমা – নইলে কী করতাম? দৌড়ে গিয়ে তোমায় … যাক গিয়ে … এবার বোধহয় ফোন রাখতে হবে। ওর ফেরার সময় হয়েছে …

পলাশ — তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকাও নি কখনও। সঙ্গত কারণেই নিশ্চয়ই। যতদিনে বিদেশ থেকে ফিরলাম, নিশ্চয়ই বিয়ে করে সংসার করছ। ছেলে মেয়েও উপহার দিয়েছ। এদিকে উনি আমি পরস্পরকে চোখেও দেখি নি। তাই রাগটা রহস্যময়।  

অরুণিমা — হয়তো তাই। অত শত বিশ্লেষণ করে না।  

পলাশ – মিছিমিছি ওনার বিরক্তির কারণ হয়ে গেলাম। আচ্ছা, তুমিই বা আমাকে ফোন কর কেন? আমাদের কি কোনো সম্পর্ক হওয়া আর সম্ভব? অবশ্য শব্দ তরঙ্গের আদান প্রদানটাও একটা সম্পর্ক হতে পারে।  

অরুণিমা – হবেও বা …  

পলাশ – আর তারপর যদি শব্দের ছোঁয়াটা অন্য কোনো ছোঁয়ায় পরিণত হয়? তাও কি সম্ভব?  তুমি থাক নৈহাটিতে, আমি উলুবেড়িয়ায়। হাতে ছোঁয়া তো কোনো ভাবেই সম্ভব না। শব্দ দিয়ে যদি তোমায় ছুঁয়ে ফেলি … হয়তো তাই ভাবেন …

অরুণিমা — কী রকম?

পলাশ — মন ছোঁয়া যায় না? তার সঙ্গে দেহের তো সম্পর্কই নেই। উনি বুদ্ধিমান লোক সন্দেহ নেই। ইংরেজিতে sensitive …

অরুণিমা – বলছ?  

পলাশ – প্রেমের জন্য দেহের চেয়ে মনের প্রয়োজন বেশি …  

অরুণিমা – তাই বোধহয় …

পলাশ – তাই বোধহয়? তার মানে তুমি কি এতকাল পরে আমায় ভালবাসতে পারবে? যখন তোমার সঙ্গে শারীরিক নৈকট্য থাকা সম্ভব ছিল, তখন কিন্তু ভালবাস নি। এখন তো কেবল মনটাই বাকি আছে।

অরুণিমা – তুমিই কি ভালবেসেছিলে? একদিন আধ ঘণ্টা কথা বলে কি ভালবাসা যায়? বললাম তো, আমি তো ছিলাম, তুমি কী করছিলে?

পলাশ – আমিও বললাম তো, তোমার তাড়া খাচ্ছিলাম …

অরুণিমা — এবার ছাড়ি …

পলাশ — আমার বয়েস আশি – তোমারও কাছাকাছি। তোমাকে দেখে চিনতেও পারব না। ওনাকে এটা বলেছ তো?

অরুণিমা — বেল বেজেছে। ছাড়লাম।

পলাশ — দাঁড়াও, দাঁড়াও — তুমি আমাকে আদৌ ফোন কর কেন? সেটা তো বলবে?

অরুণিমা – ছাড়লাম।  

ফোনটা এখন বোবা। পঞ্চাশ বছর আগের শরতের রাঙা একটা দুপুর পলাশের মনে পড়ে। ছবিটা পুরোন হল না। সে চোখ বুজে শোনে কে যেন ফিসফিস করে বলছে — শরীর? শরীর? তোমার মন নাই কুসুম?  

লোকটা – অণুগল্প

রাস্তার মোড়ে ফুটপাতে বসেছিল। কুচকুচে কালো জামা, কুচকুচে কালো হাফ প্যান্ট। ছেঁড়াখোঁড়া। হাত পা মুখ, ঝাঁকড়া, ঝাঁকড়া চুল, দাড়ি গোঁফ। সব কুচকুচে কালো। আসলে হয়তো লোকটা ফরসাই। সতেরো বছর স্নান করে নি।

আমাকে দেখেই ফিক করে হাসল। ঝকঝকে সাদা দাঁত। চোখ দুটোও ধবধবে সাদা। বলল – এই শোন, খুব লজ্জা করছে। আমি চলেই যাচ্ছিলাম। পাগল ভেবে।

ও আবার বলল – খুব লজ্জা করছে রে।

আমি থেমে গিয়ে ওর দিকে হাঁ করে চেয়ে রইলাম মিনিট খানেক। তারপর বললাম – কেন?

ও আবার ফিক করে হেসে বলল — এই ভিক্ষে চাইতে। ভিক্ষে দিবি? আগে আমি ভিক্ষে করতাম না। সত্যি বলছি মাইরি।

বললাম – কী করতে?

লোকটা খুব গম্ভীর হয়ে কী সব ভাবল। তারপর আবার আগের মত ফিক করে হেসে বলল — সত্যি বলছি মাইরি। মনে নেই। কিচ্ছু মনে নেই। সে অনেকদিন আগের কথা। তখন মানুষ ছিলাম।

সময় নষ্ট না করে ওকে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে আবার হাঁটা লাগালাম।

ও মহা চেঁচামেচি শুরু করল। – ওরে আশীর্বাদ নিয়ে যা, আশীর্বাদ নিয়ে যা।

চমকে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখি ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো দেখিয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়ে পড়ল।

– শোন, আশীর্বাদ নিয়ে যা। তুই বড় ভাল লোক। আশীর্বাদ করছি, পরের জন্মে তুই একটা ফুল হয়ে জন্মাবি।

বললাম – সে কী? ফুল হয়ে জন্মালে তো দু-তিন দিনের বেশি বাঁচবই না।

সে বলল – সেটাই তো চাই।

চলে যাচ্ছি, সে আবার ডাকাডাকি শুরু করল।

– বেশি বাঁচতে চাস? আচ্ছা অন্য আশীর্বাদ দিচ্ছি। তুই পরের বার একটা গাছ হয়ে জন্মাবি।

বললাম – এটা একটা কথা হল! কোথায় না কোথায় দাঁড়িয়ে থাকব, আর গরুতে খেয়ে নেবে। রাখ তোমার আশীর্বাদ।

– না, না। গরুতে খাবে না। তোর চারপাশে একটা বেড়া থাকবে। গরু খাবে না।

-বেড়াটা দেবে কে? তুমি?

– দুত্তোর! আমি বেড়া দেব কেন? যার বাড়ির উঠোনে তুই জন্মাবি সেই বেড়া দেবে।

– বাবা, উঠোন, বেড়া কত কিছু। তা বাড়ির মালিকটা কে হবে শুনি।

হো হো করে হেসে উঠল সে।

– বুঝেছি রে বুঝেছি। তোর মালিক হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। ঠিক আছে তুই মালিক হবি। তখন তোকে গরুতে খাবে না।

– বাঃ, ভাল কথা।

– কিন্তু বাঘে খাবে।

– অ্যাঁ — বল কী? আশীর্বাদ করে আমাকে বাঘের পেটে পাঠাচ্ছ?

– তা যা বলেছিস। তুই লোক ভাল। তোকে বাঘে খাবে না।

-তাই? ঠিক জান তো?

– তোকে বাঘে খাবে না। তোকে মানুষেই খাবে। তুই লোক ভাল। তাই তোকে মানুষে খাবে। আগের জন্মে আমি যখন মানুষ ছিলাম, তখন আমাকেও খেয়েছিল।

এবার আর দাঁড়ালাম না।

বিপিন বাবুর রহস্য -অণুগল্প


“নিজস্ত্রী সলজ্জা হইবে এবং পরস্ত্রী নির্লজ্জা হইবে ইহাই রসজ্ঞজনের কাম্য।” একথা বিপিন বাবু বহুকাল আগেই জেনেছিলেন পরশুরামের ‘হনুমানের স্বপ্ন’ পড়ে। কিন্তু ‘কার্যকালে সমুৎপন্নে’ প্রায় সমস্ত পরস্ত্রীই কিষ্কিন্ধ্যার নিকটবর্তী কিচ্চট দেশের দুর্বিনীতা বানরী রাজকন্যা চিলিম্পার মত ব্যবহার করে তাঁকে বিদায় দিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে পরশুরাম প্রদর্শিত কাম্য বস্তু সহজলভ্য নয়। চিলিম্পার হাতে সুগ্রীব প্রবল ভাবে নিগৃহিত হয়েছিলেন, যদিও হনুমানের সঙ্গে চিলিম্পা পেরে ওঠেন নি। বিপিন বাবু হনুমান সম তেজস্বী না হওয়ায় প্রথমটা বিশেষ কিছুই করে উঠতে পারলেন না। তবে শারীরিক বল না থাকলেও তাঁর অল্পস্বল্প বুদ্ধিবল ছিল। সেই বুদ্ধি প্রয়োগ করে এবং কিঞ্চিৎ তন্ত্র মন্ত্রের সাহায্যে বিপিন বাবু কিছুদিন পর থেকে নিজস্ত্রীকেই নির্লজ্জা পরস্ত্রীজ্ঞানে দেখতে শুরু করলেন। এই পথে চলে তিনি অভূতপূর্ব পরোঢ়া প্রেম উপভোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে শোনা যায়। অবশ্য বিপিন বাবু স্বর্গারোহণ করার আগে নিজমুখে এই রহস্য কাহিনি বলে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নি। এদিকে তাঁর নিজ বা মতান্তরে পরস্ত্রীও কাউকে কোনও সাক্ষাৎকার দিতে নারাজ। দুর্ভাগ্যক্রমে গবেষকরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছেন না।

ভগবানের জন্মদিন — অণুগল্প

ভগবান এত বুড়ো যে ভুলেই গিয়েছে কবে তার জন্মদিন। কেবল যে ভগবানকে তৈরি করেছিল তার শর্ত অনুসারে, ভগবান মরতে পারবে না। অবশ্য সে লোকটা যে কে তা ভগবান জানে না। ভগবান অনাথ, অথচ তার বিপুল ক্ষমতা।

এই ক্ষমতার জোরে ভগবান পৃথিবী বলে একটা জায়গা সৃষ্টি করল। পৃথিবী ভরিয়ে দিল হাজার হাজার জিনিসপত্রে। হেঁটে চলে বেড়ায় এমন জিনিসও ভগবান তৈরি করল। তারপর একদিন হঠাৎ মানুষ বলে এক জীব বানিয়ে ফেলল। মানুষ বানিয়ে অবধি ভগবান ভারি খুশি। কারণ একমাত্র মানুষরাই ভগবানকে দেখতে পায়। অবশ্য সব মানুষই যে এক ভাবে ভগবানকে দেখে তা নয়। পৃথিবীর নানা জায়গায় ভগবানের নানা আকৃতি। প্রকৃতিও। তবে ভগবান নিজে কোনোদিনও নিজেকে দেখেনি। ভগবান নিজেকে দেখার আয়না আবিষ্কার করতে পারে নি।

এদিকে মানুষ ভগবানকে দেখতে পায়। আর ভগবান সম্পর্কে মানুষ একটা জবর খবর রাখে। খবরটা হল ভগবান চাইলে সব কিছু করতে পারে। যত শক্ত কাজই হোক, ভগবান করতে পারে। সব সময় যে ভগবান মানুষের ইচ্ছে মত কাজকর্ম করে দেয় এমন না। অনেক মানুষ আছে যারা পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে চায়। তারা রাতদিন ভগবানের পুজো করে, ফুল বেল পাতা দিয়ে। যাদের পয়সা কড়ি আছে তারা মন্দির বানিয়ে তার ভিতর ভগবানকে আরাম কেদারায় বসিয়ে রাখে। কিন্তু আসল সময় দেখা যায় ভগবান তাদের সেকন্ড বা থার্ড করে দেয়। কী কারণে অন্য কাউকে ফার্স্ট করে দেয় কে জানে।

অনেকে মরতে চায় না। ভগবান তাদের কথাও শোনে না। ভগবান অতি স্বার্থপর। নিজে অমর থেকে বাকি সকলকে নশ্বর বানিয়েছে। এটা যে ঘোর অবিচার তা জেনেও হাজার কোটি লোক ভগবানের কাছে আম, জাম, লিচু, দই, সন্দেশ, সুন্দরী বউ, গাড়ি,বাড়ি কেবল চেয়েই যায়।

এমন করে অনন্ত কাল কেটে গেল। ভগবানের ভাণ্ডার থেকে রোজই অজস্র কিছু জিনিসপত্র অজস্র মানুষদের দিতে হয়। সর্বক্ষণ। প্রত্যেক মুহূর্তে। যেখানেই মানুষ জেগে আছে সেখানেই ভগবানের উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। আর পৃথিবীর সর্বত্র সব সময় কেউ কেউ না কেউ জেগে থাকে। পৃথিবী তৈরি করার সময় ভগবান এটা খেয়াল করে নি যে মানুষ যদি সর্বক্ষণ জেগে থাকে তবে ভগবানের ঘুমোবার সময় থাকে না। ঘুম পেলেও ঘুমোরার জো নেই। হাই তুলতে তুলতে মানুষদের আবদার শুনতে হয়। তারপর ভাবতে হয় কোন আবদার রাখবে, কোন আবদার রাখবে না। যাদের আবদার মেটে না তারা মাঝে মাঝে ভগবানকে গালমন্দও করে। অভিশাপ দেয়। সেটাও ভগবানকে শুনতে হয়।

গালাগাল শুনতে শুনতে একদিন ভগবান গেল ভীষণ চটে। ভাবল — আমি জন্মালাম কেন? সবাই মরে, আমি মরি না। যাচ্ছেতাই।

তারপর নানা চিন্তা করে মানুষকে জব্দ করার একটা উপায় বের করে ফেলল। ভগবান নিয়ম করল তাকে আর পুজো করা চলবে না। মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার আরও যেখানে যেখানে পুজো করা হয় সব কিছু বন্ধ করে দিল। ভগবানের কাছে কিছু চাওয়ার কোনও পথ রইল না।

আসলে অনেকদিন ধরে ভগবান কিছু তৈরি করে নি। এবার হঠাৎ এক মারাত্মক অস্ত্র বানিয়ে ফেলল। মানুষ তার নাম দিল করোনা। করোনা মানুষকে ধরলেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। আর ভগবান মরতে চাইলেও, মানুষ কিছুতেই মরতে চায় না। আবার করোনাকে মানুষ কাবুও করতে পারে না। কেবল একটা ব্যাপার বোঝা গেল। করোনার থেকে দূরে থাকতে গেলে মানুষের থেকেও দূরে থাকতে হবে। নইলে একটা মানুষকে চিবোতে চিবোতে কাছাকাছি মানুষের উপরেও লাফিয়ে পড়ে করোনা তাকে চিবোতে পারে। ভগবান এই ভাবেই করোনা তৈরি করল।

এটা দারুণ বুদ্ধির খেলা। কারণ মন্দিরগুলোতে, গির্জাগুলোতে, মসজিদগুলোতে মানুষের বেজায় ভিড়। ঠাসাঠাসি,গাদাগাদি। সকলেই ভগবানের কাছে আগে আগে আবেদনপত্র জমা দিতে মারামারি করছে। এদিকে করোনা তো ভগবান সর্বত্র ছড়িয়ে রেখেছে। ধাক্কাধাক্কি করতে গিয়ে মানুষরা একে অপরের থেকে দূরে থাকা ভুলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে করোনা মানুষের মধ্যে ঢুকে তাদের বেঁচে থাকার রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

শেষ অবধি মানুষ বুঝতে পারল যে বাঁচতে হলে একা একা বাঁচতে হবে। সকলে মন্দির টন্দির ছেড়ে পালাল। ঘরের ভিতর লুকিয়ে বসে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। মানুষের লক্ষ কোটি চাহিদার কথা আর মনেই রইল না। সকলের মনের মধ্যে একটাই চাহিদা। ফার্স্ট হতে চাই না, নামধাম চাই না, টাকা পয়সা চাই না। শুধু বেঁচে থাকতে চাই। বেঁচে থাকার চেয়ে মধুর কিছু নেই।

ভগবানের ভাণ্ডার জিনিস দিতে দিতে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই ভাণ্ডারে মানুষের অমরত্ব কোনোদিনই ছিল না। তাই মানুষকে দেবার মত ভগবানের কাছে কিছুই রইল না। এবং আস্তে আস্তে কোনো না কোনো কারণে সমস্ত মানুষই মৃত্যুবরণ করল। কেউ করোনায়। কেউ অন্য রোগে, লুকিয়ে থাকা ডাক্তার বদ্যির খোঁজ না পেয়ে। কেউ অনাহারে।

শেষ মানুষটা মরে যাওয়ার পর ভগবান বড় খুশি হল। ফিক করে হেসে নিজেই নিজেকে বলল — আজ আমার জন্মদিন। হ্যাপি বার্থ-ডে টু ইউ।

লোকটা (অণুগল্প ১০)

লোকটা গড়গড় করে আমার নেম প্লেটটা পড়ছিল। বেশ উঁচু গলায়।  নাম, আমার পেশার খবর, ঠিকানা। পড়া হয়ে গেলে একটু দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে পাশের বাড়িতে গিয়ে আবার নেম প্লেটের সামনে দাঁড়াল। আমিও রাস্তায় নেমে এসে  তাকে দেখতে লাগলাম। শুনতে পেলাম সেখানেও নেম প্লেট পড়ছে। অনুপম নাগ। বিএ এ, বি এল, অ্যাডভোকেট, কলকাতা হাই কোর্ট। ৩৪/১ এগডালিয়া রোড। আবার বেশ জোরে জোরে। এত ভোরে আমার মত অনুপম বাবুরও কি ঘুম ভাঙাল?

আমিই কথা বললাম। এই যে, শুনছেন? সে চমকে ঘুরে আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল।

আমি বললাম — কী চান আপনি?

— আমি কিছু চাইব কেন? আপনিই তো চাইছেন।

— আমি চাইছি? আমি আবার কী চাইলাম।

— কেন? এই তো জানতে চাইলেন আমি কী চাই?

কথাটা ঠিক।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আমার দিকে। একটু পিছু হটে এলাম গেটের ভিতরে। যদি গুণ্ডা টুণ্ডা হয়। মারতে পারে। কিন্তু সেসব কিছু করল না। কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল — আপনি কে? আমি আমার নামটা বললাম। শুনে তাড়াতাড়ি সে গিয়ে আমার নেম প্লেটখানা আবার দেখল। আপনি তো এই নেম প্লেটের নাম বলছেন।

— হ্যাঁ, তাই তো বলছি।

একটা অদ্ভুত অবিশ্বাসের হাসিতে তার মুখ ভরে গেল। তারপর বলল — ওটা তো আমি। এত মিথ্যে কথা বলেন কেন বলুন তো?

— কী মিথ্যে কথা বললাম?

— এই তো একটু আগে বললেন আপনি কিছু চান নি। এদিকে চেয়েছেন। এখন নাম ভাঁড়াচ্ছেন। বুড়ো বয়েসে লজ্জা নেই।

চটে গিয়ে আমি বললাম — মিথ্যে কথা তো আপনি বলছেন। আমার নামটা বলছেন আপনার।

লোকটা অট্টহাসি করে উঠল।

— হাঃ হাঃ হাঃ … এরপর তো বলবেন অনুপম নাগও আপনারই নাম ।

— তা কেন বলব? সে তো পাশের বাড়ির লোকের নাম?

লোকটা কেমন যেন ঘাবড়ে গেল।

— অনুপম নাগ তো আমার নাম। ঐ বাড়িতেও একই কর্ম চলছে? এতো দেখছি জোচ্চোরে ভরা একটা পাড়া। এরপর হয়তো বলবেন উলটো দিকের ভবতোষ পালও ঐ বাড়ির লোকটার নাম।

— বলবই তো। ভবতোষ বাবুকে তো চিনি। উলটো দিকের বাড়িতে থাকেন।

— কী? এত বড় আস্পর্ধা! আমি ভবতোষ পাল আপনার উলটো দিকের বাড়িতে থাকি?

লোকটা বলে চলে।

— রোজ এসে দেখি প্রত্যেকটা লোক বাড়িতে আমার নেম প্লেট লাগিয়ে রেখেছে। কেউ বাদ যায় নি। এতদিন কিছু বলি নি। এবার …

ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি বললাম — এবার কী?

— ব্যবস্থা নেব, ব্যবস্থা …

— কীসের আবার ব্যবস্থা নেবেন?

লোকটা কোনও জবাব দিল না। আমিই আবার বললাম।

— আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো?

শুনে লোকটা প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কি যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিছু না পেয়ে আমার দিকে ফিরে তাকাল।

— পেলাম না।

— কী পেলেন না?

— কী আবার? আমাকে। আপনি এত কিছু চান কেন বলুন তো?

— কোথায় থাকেন?

অগ্নিদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে বলল — থাকি না।

— এভাবে বিরক্ত করছেন কেন ভোর বেলাতে? এখন কটা বাজে জানেন?

— জানি।

— কটা বাজে?

— বাজে না।

তারপর লোকটা হন হন করে হেঁটে চলে গেল। হয়তো কাল আবার আসবে।

গবরমেন্ট – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৯)


-হ্যালো, মহাদেব বলছি…
-সে কী? কেন?
-কেন মানে? আরে আমি মহাদেব বলছি …
-আরে আমিও তাই তো জানতে চাইছি, কেন বলছেন?
-এ তো অদ্ভুত কথা। আমি মহাদেব আপনাকে কেন ফোন করছি আপনার চেয়ে ভাল কে জানে?
-বলতে পারব না, এর আগে তো ফোন করেন নি …
-ইয়ার্কি মারছেন? মহাদেব আগে আপনাকে ফোন করে নি?
-না কোনোদিনও করে নি। মহাদেব কাউকে ফোন করে বলে জানতামও না …
-মশকরা হচ্ছে? আপনি সাত দিন সময় চেয়েছিলেন, …
লাইনটা কেটে গেল, যেমন কথার মাঝখানে লাইন কেটে যাওয়ার কড়া নিয়ম আছে।
তারপর আবার ক্রিং ক্রিং ক্রিং। না ধরলেও পারতাম, কিন্তু বদভ্যাস বশত ধরলাম।
-হ্যালো … মহাদেব বলছি।
-জানি।
-বলছিলাম আপনি সাত দিন সময় চেয়েছিলেন, আমি দিয়েছি। এবার যদি ঝামেলা করেন তবে অন্য রাস্তা ধরতে হবে।
-কীসের সময় চেয়েছিলাম? আপনি তো বিপদে ফেললেন দেখছি…
-আরে আমি আপনাকে বিপদে ফেললাম না আপনি আমাকে বিপদে ফেললেন … কালকে আমার মেয়ের বিয়ে, এখন কোথায় যাব?
-আপনার মেয়ের বিয়ে? আপনার মেয়ের বিয়ে নিয়ে আমি ঝামেলা করব কেন বলুন তো? আমার বয়েস ছিয়াশি। আশ্চর্য ব্যাপার তো!
-অ্যাডভান্স পর্যন্ত দিয়ে রেখেছি আর এখন বলে কীনা মহাদেব কে?
বাপ রে! মহাদেব অ্যাডভান্স দিচ্ছে। ভাগ্যবান লোক আমি।
-অ্যাডভান্স??? কেন অ্যাডভান্স দিয়েছেন? আমিই বা নেব কেন? আমি কি সাপ্লায়ার নাকি?
-সাপ্লায়ারই তো।
-কীসের সাপ্লায়ার মশাই? আমি কখনও সাপ্লাই টাপ্লাই দিই নি। কী যে সব বলেন।
-আরে চারশ লোক খাবে। আপনি পান্তুয়া আর বোঁদে সাপ্লাই দেবেন বলে অ্যাডভান্স নিয়েছেন। এখন টাকা মারবার তাল কষছেন?
-পান্তুয়া!!! বোঁদে!!!!! চারশ লোকের জন্য পান্তুয়া আর বোঁদে? আমি?
-হ্যাঁ আপনি। সীতারাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। আবার কে?
-কিন্তু আমি তো সীতারাম ভাণ্ডার নই।
-আরে আপনি সীতারাম হবেন কেন? সে তো আপনার বাবা। আপনি শিবরাম না কী যেন একটা। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে … কেনারাম নস্কর। ৯৯৫৫৫ ৬৬৮৮৮। এটাই তো আপনার নম্বর।
-না।
-না? না মানে?
-না মানে না। আমার নম্বর ৯৯৫৫৫ ৮৮৬৬৬।
একটু চুপ। তারপর …
-তাই নাকি? এয়ারটেল তো?
-সেরকমই তো শুনেছি।
-আগে বলবেন তো? মিছিমিছি সময় নষ্ট করছেন কেন আমার? ফালতু পার্টি কোথাকার!
-আজ্ঞে আপনি তো পান্তুয়া আর বোঁদে চাইছিলেন, নম্বর তো চান নি।
-দূর, গাধার বাচ্চা!
একবার সীতারামের বাচ্চা বলে, একবার বলে গাধার বাচ্চা।
-সময় নষ্ট করে দিল। উজবুক কোথাকার। ডেকরেটরটারটাও আসেনি। যত দিন যাচ্ছে লোকজনের বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। হবে না – যা গবরমেন্ট! যতোস্‌সব। ধ্যাত্তেরি!
লাইন কেটে গেল।

 

ধুউউশ্‌’শাআআলা — ফোনুগল্প (অণুগল্প ৮)


– হ্যালো!
– হ্যালো! উচ্চগ্রামে।
– হ্যা—লো–ওওও …
– হ্যা—লো—ওওওওও …। আরও উচ্চগ্রামে।
– ধুঃ—শালা। কেটে গেল।
– ক্রিইং ক্রিইং –
– হ্যালোওওও – হ্যাঁ, এতবার তো হ্যালো হ্যালো বললাম – তুই তো শালা জবাবই দিলি না –
– জবাব দিলাম না মানে? আমি তো কতবার বললাম …
– কী বললি? – হ্যালো – হ্যালো – শুনতে পাচ্ছিস? – হ্যাঁ – কী বললি? –
– কী আবার বলব? – হ্যালো হ্যালো বললাম … তুই তো শালা চুপ করে রইলি … তারপর লাইন কেটে দিলি … হ্যালোওওও … শুনতে পাচ্ছিস? … কী বললি? … লাইন কাটিস নি? … হ্যালো হ্যালোওওও …
– ধুঃউউউশ্‌’শালা, আবার কেটে গেল …
– ক্রিইং ক্রিইং –
– হ্যালোওওও – হ্যাঁ হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি বেশ পরিষ্কার এবার – কী? হাবুলের ফোন নাম্বার? হ্যাঁ, আছে তো। দাঁড়া তোকে ওয়াট্’স অ্যাপ করে দিচ্ছি। কেন, ওয়াট্‌’স অ্যাপ করব না কেন? তোদের ইন্টারনেট চলছে না? এস্ এম্‌ এস্‌? কাজ করে না? ও আচ্ছা, দাঁড়া, দাঁড়া, একটু খুঁজে নিয়ে বলছি। … হ্যাঁ পেয়েছি … লিখে নে … ৯৯৪৩ … কী বললি? … আরও জোরে বলব? ঠিক আছে … ৯৯৪ … আরে এর চেয়ে জোরে বলব কী করে? গলায় চিড় ধরবে তো … কেন শুনতে পাচ্ছিস না ভাল করে? তোর কানে গণ্ডগোল হয়েছে … অ্যাঁ … বাসের আওয়াজ? … শোনা যায় না … কী? … বাসের আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যায় না তোদের পাড়ায়? … ঠিক আছে … তবে নয় রাতে ফোন করব … হ্যালোওওও … ধুউউউশ্‌শালা … আবার কেটে গেল …

রাত এগারোটার পর।

– হ্যালোওও …
– হ্যাঁ বল্‌ — শুনতে পাচ্ছি …
– তাড়াতাড়ি লেখ্‌ … ৯৯ … কী বললি? শুনতে পাচ্ছিস্‌ না? আরে রাত দুপুরে এমন গলা ফাটিয়ে ফোন নম্বর বলতে হলে তো পুলিশ ধরবে … আর কত চেঁচাব? এখনও বাস যাচ্ছে নাকি? যাচ্ছে না … তাহলে তো তুই কালা বলব … কী? কী বললি? কুকুর? কুকু—র? তাড়া করেছে? করে নি? তবে? চেঁচাচ্ছে? দশটা কুকুর? রাস্তার কুকুর? তোর বাড়িতে দশটা রাস্তার কুকুর কী করছে? বাড়িতে না? রাস্তায়? কুকুররা কুকুর দেখলে খেপে যায়? সব তোর বাড়ির সামনে? কর্পোরেশনে খবর দে না, ধরে নিয়ে যাবে। কী বললি? তোকেও ধরে নিয়ে যাবে? নতুন আইন? তাহলে কী করব? ফোন রেখে দেব? কী বললি? কী বললি? … ধুউউউশ্‌’শাআআলা … লাইন কেটে গেল …

সবুজ শাড়ি — অণুগল্প ৭


ভদ্রমহিলা বারবার বলছেন – আমি যাব, আমি যাব।

ব্যাঙ্কে পাসবুক আপ-টু-ডেট করার মেশিনের লম্বা লাইনের পাশটিতে দাঁড়িয়ে। এক ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন – লাইনে দাঁড়ান। দেখছেন না লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সবাই।

শুনেও মহিলা বললেন – আমি যাব, আমি যাব।

আমি লাইনেই দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে। ফলে তখন প্রায় মেশিনের ধরা ছোঁওয়ার মধ্যে এসে গিয়েছি। আমার আগের ভদ্রলোকের কাজ শেষ হয়ে যেতেই আমার পালা এল।

এদিকে আবারও সেই আমি যাব, আমি যাব।

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে মহিলাকে দেখলাম। বয়স্কা। জিজ্ঞেস করলাম – আপনি কি আমার আগে যেতে চাইছেন?

এক গাল হেসে উনি মাথা দুলিয়ে জানালেন তেমনটাই তাঁর ইচ্ছে।

তারপর বললেন – অনেক বয়েস তো, দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। কষ্ট হয়।

আমি বললাম – ঠিক আছে আপনিই আগে চলে আসুন। আমার বয়েস কিন্তু আপনার সমান বা তার চেয়েও বেশি।

অসীম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উনি বললেন – ধ্যুৎ! আমি অনেক বড়।

আমি আবারও বললাম – হতেই পারে না।

উনি বললেন – কেন পারে না? আমার বয়েস ৮৮।

একটু চমকে উঠলাম। ঠিকই বলেছেন। বেশ খানিকটা বড়। ওনার শাড়ির রঙটা সবুজ। তাই হয়তো ভুল করলাম। এক জ্যোতিষি বলেছিল অতদিন আমি নাকি বাঁচবই না। এইসব ভাবছি, এমন সময় মহিলা বললেন – আমি তো এইসব মেশিন দিয়ে কিছু করতেই পারি না। আপনি করে দিন। বলে পাসবুকটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন নিশ্চিন্তে।

কী মুশকিল। কেন যে পরোপকার করতে গেলাম? সবুজ শাড়িটা যত অনর্থের মূল। ওনার পাসবুক যন্ত্রস্থ করে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেশিন নিজের মনে কী সব গজগজ করে হঠাৎ খাতাটা উগরে বের করে দিল। মহিলা আমার কর্মক্ষমতার উপর পরম বিশ্বাসে তখনও সবুজ শাড়িতে শোভা পাচ্ছেন। এদিকে আমি দেখি মেশিন লিখিত ভাবে ঘোষণা করছে – বার-কোড মিলছে না। আপ-ডেট করা সম্ভব না।

খাতাটা বের করে উলটে পালটে দেখলাম বার-কোড লাগানোই নেই।

বললাম – এ কী? বার-কোড লাগানো নেই তো। তাহলে যন্ত্র তো আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করবে না।

সবুজ শাড়ি বললেন – তাই? বার-কোড কী? একদম অসহায় চাহনি। মনটা খারাপ লাগল। ওনার হয়ে এই কাজটা করার জন্য ছেলে মেয়ে জাতীয় কেউ নেই নিশ্চয়ই। হয়তো ছিল, মরে গিয়েছে। মানে হয়তো আমেরিকাতে থাকে। কিংবা অস্ট্রেলিয়া। কিংবা ফিনল্যান্ড।

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম ওনার ছেলেপুলেরা মরে গিয়েছে কীনা। করলাম না। তার বদলে আঙুল দেখিয়ে বললাম – দেখুন তো, ঐ কাউন্টারটায় বোধহয় ওরা বার-কোড লাগিয়ে দেবে। নিজের পাসবুকটাও ওনাকে দেখালাম, বার-কোড কাকে বলে চেনাবার জন্য। ওনার মৃত ছেলে মেয়েরা এই কাজটা করে যায় নি মনে হল। উনি আর কিছু বললেন না। আস্তে আস্তে কাউন্টারের খোঁজে চলে গেলেন।

একটু অপরাধ বোধ যে হল তা স্বীকার করতেই হয়। আমিও তো সঙ্গে যেতে পারতাম। কিন্তু এও ভাবলাম — কত সন্তানহারাকে বার-কোড বোঝাব?

স্বার্থপরের মত নিজের কাজটুকু করে বেরিয়ে এলাম। নিজের কাজ তো হল, কিন্তু মনটা কেবল খোঁচা মারছে। ওনার ছেলে মেয়ে তো সেই কবেই চলে গিয়েছে। হয়তো ওদের শেষ দেখেছেন ১৯ বছর আগে। এয়ারপোর্টে বাই বাই করার সময়। কেমন দেখতে তাই কি আর মনে করতে পারবেন?

কী যে করি! সারাক্ষণ কানে বাজছে — আমি যাব, আমি যাব।

পরণে সবুজ শাড়ি, বয়েস ৮৮।

লাইফ – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৬)

— হ্যালো! নারীকণ্ঠ, বিরক্তিপূর্ণ।
— হ্যালোও। আমি, একটু ঘাবড়ে।
— আচ্ছা, আপনি কী চান ঠিক করে বলুন তো…
সকালে একবার জিলিপি খেতে ইচ্ছে করেছিল। রোজই করে। এ ছাড়া আর তো কিছু চাই নি। জিলিপির দোকান আজকাল ফোন করে? কে জানে? সুইগির যুগ।
— আজ্ঞে, আজ তো জিলিপি চাই নি।
— কী চ্যাংড়ামো করছেন!
— তা কেন করব? চাই নি, সত্যিই চাই নি। কোনো কিছুই চাই নি।
— চান নি? কিছুই চান নি? বিরক্তি থেকে উষ্মার দিকে।
— না তো … । দুশ্চিন্তায় আমি।
— তাই বুঝি? তবে রোজ এসব করছেন কেন?
মেয়ে পুলিশ না তো? ভাবনায় ঘামতে শুরু করি।
— রোজ কী করছি ম্যাডাম?
— কী করছেন? আবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে?
গা ছমছম করে ওঠে।
— কী, জবাব দিচ্ছেন না কেন?
মনে হল বন্দুকটা আমারই দিকে টিপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
— কেমন করে জবাব দেব ম্যাডাম? আপনার কথা তো বুঝতেই পারছি না।
— ন্যাকা তাই না? বুঝতে পারছেন না? রোজ মেসেজ পাঠাচ্ছেন কেন? এই ওয়ান টু দিয়ে শেষ নম্বরে …
— দেখুন মেসেজ তো পাঠাই অনেক। কিন্তু ওয়ান টু নম্বরে কী পাঠালাম মনে করতে পারছি না।
ওপাশে আরও কয়েকটি নারীকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। ফোনের নারীকণ্ঠ অন্যদের বলছে শুনলাম।
— এই দেখ্ তো, জানতে চাইছে কী মেসেজ করেছে।
— হ্যালোওওও … আপনি রোজ মেসেজ করছেন আর বলছেন কী মেসেজ জানেন না!! আরেকটি গলা।
— আজ্ঞে তাইতো বলছি। ভয়ে গলা একটু কাঁপে।
— আপনি কোথা থেকে বলছেন? খুব রেগেছে।
— আমি কোথা থেকে আর বলব ম্যাডাম? আপনার বন্ধুই তো কোথা থেকে বলতে শুরু করলেন। আমি নাকি মেসেজ করি। কী মেসেজ একটু বোঝাবেন …?
— কী মেসেজ? একটাই তো মেসেজ। আপনি লাইফ চান …
— লাইফ চাই? তার মানে কী?
জিলিপি না তাহলে। সন্দেশ, জিলিপি, পান্তুয়া, কিছুই না? হায় হায়।
— রোজ বলছেন লাইফ চান, আর এখন বলছেন মানে জানেন না?
— দেখুন, সত্যিই জানি না। আপনি কি এল আই সি থেকে বলছেন?
— কী? রেগে আগুন, তেলে বেগুন।
— মানে লাইফ ইন্সিওরেন্স কর্পোরেশন থেকে বলছেন?
— আবার বাজে বকছেন?
— আমি লাইফ ইন্সিওরেন্সের কথা বলছি। রাত সাড়ে নটায় এল আই সি তো ফোন করে না। তাছাড়া আমার বয়েস আশি পেরিয়েছে। ও লাইফ আর ইন্সিওর করে কী লাভ? আমার গলায় এবার আত্মবিশ্বাস।
আর ওদিকে যেন একটু যেন অস্বস্তি।
— আপনি লাইফ চেয়ে চেয়ে ওয়ান টু-তে ফোন করছেন আর এখন …
— ম্যাডাম, লাইফ আমাকে চায় না। আমি আর লাইফকে চেয়ে কী করব বলুন? তবে জিলিপি এখনও দিব্যি চাই।
লাইন কেটে গেল। কোনোমতে লাইফ কাটাচ্ছি। না চেয়েই। দেখি কতদিন চলে!

পার্সোনালিটি – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৫)

আমাকে কেউ ফোন টোন করে না। তাই আমিও করি না। কিন্তু মাসের শেষে ফোনের বিল দিই। কেন কে জানে? বিমর্ষ লাগে। মাঝে মধ্যে অবশ্য ফোন বেজে উঠে হর্ষ জাগায়। আমি উৎসাহে লাফিয়ে উঠি।

–হ্যালোওওও।

অপর দিক থেকে পুরুষ বা নারী কণ্ঠ শোনা যায়।

— কে কানাই ড্রাইভার? কাল আসবি বলে এলি না কেন?

বুঝি এ ফোন আমার নয়। তবু জবাব দিই।

–মিথ্যে কথা বলেছিলাম। তুই বরং চলে আয়।

কণ্ঠস্বর চমকে ওঠে।

–মাল খেয়েছিস নাকি বেটা? সাহস তো কম না। তুই বলছিস!

আমি ফোন রেখে দিই।

আরেক জাতীয় ফোন আসে। নারী কণ্ঠ। আজই এসেছিল। সে আর হ্যালো বলল না।

–মিস্টার দীপংকর? আমি এয়ারটেল থেকে বলছি। আপনার জন্য একটা দারুণ অফার আছে মিস্টার দীপংকর।

এই মিস্টার দীপংকর সম্বোধনটার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। উত্তর ভারতে অনেকে মিস্টার গুপ্তা বলতেন। তাঁরা ভাবতেন ভগবানদাসের মত আমার নাম দীপংকরদাস আর পদবী গুপ্তা। বহু বুঝিয়েও তাদের দাশগুপ্ত ব্যাপারটা বোঝাতে পারি নি। কিন্তু মিস্টার দীপংকরটা নতুন ঠেকল।

–তাই বুঝি? কী অফার, আরেকটা সিম কার্ড?

— না, না, মিস্টার দীপংকর। আপনি আমাদের অনেকদিনের কাস্টোমার, তাই আপনাকে একদম ফ্রি-তে একটা স্পেশাল অফার দেওয়া হচ্ছে।

–তাই? একটু খোলসা করে বলবেন?

–অবশ্যই বুঝিয়ে দেব মিস্টার দীপংকর। এটা থাকলে আপনাকে যে ফোন করবে সে কোনও ক্রিং ক্রিং শুনবে না।

আঁতকে উঠলাম।

–সে কী? কিছু না শুনলে তো মুশকিল হবে। অবশ্য কানাই ড্রাইভারের খোঁজ করলে অন্য কথা।
–কী বললেন মিস্টার দীপংকর? কানাই? আপনি মিস্টার কানাই?

–না না, আমি কানাই না। সে অন্য লোক।

নারী কণ্ঠে খুশি উপচে পড়ে।

–মিস্টার দীপংকর, এই অফার নিলে যিনি আপনাকে ফোন করবেন তিনি শুনবেন “হ্যালো, আমি মিস্টার দীপংকর বলছি”! আর সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এটা আপনি যেকোনো ভাষায় শোনাতে পারবেন। কেবল বছরে একবার মাত্র ৩০০ টাকা দিতে হবে।

বিনা মূল্যের মূল্য ৩০০ টাকা।

তবু একটু ভাবলাম। আইডিয়াটা মন্দ নয়। কানাই ড্রাইভারের হয়ে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। তবে সে লোকটাকে এত শত কথা বলব কেন? জানতে চাইলাম।

–এমন হলে আমার সুবিধা কী?

–মিস্টার দীপংকর, কলারের কাছে আপনার পার্সোনালিটি দারুণ বেড়ে যাবে।

মেয়েটির গলায় উত্তেজনা।

–সে কী? আমার ফোন এই অদ্ভুত উপায়ে আমার পার্সোনালিটি বাড়িয়ে দেবে?

–হ্যাঁ মিস্টার দীপংকর, যে শুনবে সেই ইম্‌প্রেস্‌ড হবে।

–তাই নাকি? আচ্ছা আপনি নিজে একবার শুনে দেখুন তো। আমি মিস্টার দীপংকর বলছি। আপনি কি ইম্‌প্রেস্‌ড হয়ে গেলেন এটা শুনে?

–না, মানে আমি তো এয়ারটেল থেকে বলছি।

–না? আপনি না বললেন? ইম্‌প্রেস্‌ড হলেন না?

–না। মানে হ্যাঁ, মানে ঐ আর কী! আসলে আমি তো কোম্পানি থেকে বলছি।

–তাই তো জিজ্ঞেস করছি। আপনি ইম্‌প্রেস্‌ড হয়েছেন কি? এটা জানা খুব জরুরি। এয়ারটেল ছাড়া আর কেউই প্রায় আমাকে ফোন করে না। এয়ারটেল নিজেই ইম্‌প্রেস্‌ড না হলে ৩০০ টাকা দেব কেন?

–মিস্টার দীপংকর! এয়ারটেল তো কোম্পানি।

–আর আপনি? আপনি কী? মানুষ না কোম্পানি? আমি জানতে চাই আপনি আমার পার্সোনালিটির ব্যাপারে ইম্‌প্রেস্‌ড হয়েছেন না হন নি। আমি মিস্টার দীপংকর বলছি।

বেচারা মেয়েটা, দু-চারটে পার্টি ধরে দিতে পারলে কমিশন পাবে। একটু কষ্টই হল।

–দেখুন, আমি যাকে বলে বেশ পাঁচু টাইপের একটা লোক। পাঁচুর ঐ পা-টুকুতেই পার্সোনালিটির সঙ্গে মিল। আমার মনে হয় আপনিও আমারই মত একটা লোক। তবে আমার পার্সোনালিটি বিহীন জীবনের আর অল্পই বাকি আছে। আপনাকে কিন্তু এখনও অনেক বছর এয়ারটেলওয়ালাদের দুর্দান্ত সব অফার নিয়ে মিস্টার দীপংকরদের পিছনে ছুটতে হতে পারে। আপনাকে কেউ ফোন টোন করে? আমাকে করে না, আপনার মত ভুল না করলে।