রমেশ বাবুর মোবাইল ফোন


রমেশ বাবুর ফোনটা হঠাৎই বেজে উঠল। নতুন কিছু ব্যাপার নয়। এমন যখন তখনই বেজে ওঠে। ফোনের অবশ্য বাজারই কথা। তবে এ ফোন সে ফোন নয়। কেউ ফোন না করলেও বেজে চলে। রমেশ বাবুর অভ্যাস হয়ে গেছে। তবুও অনেকবার ফোনে হ্যালো হ্যালো বলে গেলেন। কিন্তু অপর দিক থেকে কোনও আওয়াজই শোনা গেল না। কী ব্যাপার কে জানে! অল্প দামের ফোন, হয়তো ঠিকঠাক কাজ করে না। কিছুক্ষণ হাঁ করে ফোনটার দিকে চেয়ে রইলেন। নাঃ! এবার একটা ভাল ফোন কিনতেই হবে।

আজ আবার মাইনের দিন। একবার গিন্নির হাতে টাকাটা চলে গেলে আর কেনা যাবে না। আজই কিনতে হবে। মাইনের টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে গেছে। একটা এ টি এমে ঢুকে হাজার পনের তুলে নিলেই চলবে। তারপর একদম ফোনটা কিনে বাড়ি ফিরবেন। পুরনো ফোনটার বদলে হয়তো সামান্য কিছু টাকাও পাওয়া যাবে। বেশ খুশি খুশি লাগছে রমেশ বাবুর। অনেকদিন পছন্দমত কিছু কেনা হয় নি। যা কেনার সব গিন্নি কেনেন। তার উপর এখন আবার মেয়েটাও বড় হচ্ছে। ইস্কুলের বড়লোক মেয়েগুলোর দেখাদেখি রোজই নানা বায়না লেগে আছে। ফেশাল ক্রিম, দামি জিন্‌স, আরও কত কী!

রমেশ বাবুর আপিশে পিওনের কাজ করে জগু। আসল নাম জগন্নাথ। তবে সে নামে কেউই তাকে ডাকে না। সে জগু বলেই পরিচিত। জগুও আজই মাইনে পাবে। তবে তার একটা অন্য পেশাও আছে। সে একজন দক্ষ পকেটমার। বিশেষ করে এই মাইনে পাওয়ার দিনগুলোতে তার কাজ থাকে অনেক। ভীড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়ে প্রচুর টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে। মাঝে মধ্যে দশ পনের হাজার টাকাও জোগাড় হয়ে যায়। আজ ছুটির হওয়ার জন্য কেবল মনটা আনচান করছে। যত তাড়াতাড়ি বেরনো যায় ততই ভাল। কার পকেটে টাকা আছে আর কার টাকা নেই, সেটা সন্ধ্যে হওয়ার আগেই বুঝে নিতে হয়। পকেটে টাকা থাকলে চোখ মুখের চেহারাটাই একটু অন্যরকম হয়ে যায়। ঠিক কেমন সেটা বুঝিয়ে বলা শক্ত। ওটা পকেটমার না হলে আন্দাজ করা যায় না।

টুলের উপর বসে জগু হাঁই তুলছিল। হঠাৎ চোখ পড়ল রমেশ বাবুর দিকে। একটু যেন অন্য রকম দেখাচ্ছে আজ …। কী ব্যাপার। মাসের শেষে পকেটে টাকা থাকার তো কথা না। মাইনের টাকাও তো ব্যাঙ্কে জমা পড়বে। তবে আনকোরা নতুন নোটের গন্ধ যেন ভুরভুর করছে রমেশ বাবুকে ঘিরে। জগুর ভুল হয় না। সে কাঁচা টাকার গন্ধ নিয়ে ভুল করবে না। যার যেটা ব্যবসা। বাজারের মাছওয়ালা যেমন পচা মাছ চেনে আর খদ্দের বুঝে ধরিয়ে দেয়, সেরকম কতকটা। হুম্‌, আজ রমেশ বাবুকে চোখে চোখে রাখতে হবে।

ছটার সময় রমেশ বাবু সিট ছেড়ে উঠলেন। একবার জগুর দিকে চেয়ে হাসি হাসি মুখে বললেন — কী রে! বাড়ি যাবি না?

এমন কথা রমেশ বাবু জীবনে কোনোদিন বলেন নি। মাঝে মধ্যে সিগারেট বিড়ি আনিয়ে খুচরোটা আর ফেরত নেন নি ঠিকই। কিন্তু সে তো দু-পাঁচ টাকার মামলা। তাছাড়া আজ অবধি কখনও জগুর বাড়ি ফেরা নিয়ে মাথা ঘামান নি। জগু বোঝে এ রমেশ বাবু রোজকার রমেশ বাবু নন। মোটা গোঁফ জোড়া কেমন যেন চকচক করছে। চোখ জ্বলজ্বল। বেশ একটা যুদ্ধ জেতার ভাব।

রমেশ বাবু চারতলার আপিশ ঘর ছেড়ে সিঁড়ি ভেঙে আস্তে আস্তে নামতে শুরু করেন। জগুও একটু দূরত্ব রেখে নামতে থাকে।

এমন সময় হঠাৎ ক্রিং ক্রিং করে রমেশ বাবুর ফোনটা বেজে ওঠে। সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে পড়ে উনি প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে লাগান। হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো … দুত্তোর। আবার সেই আজব ফোন। বিড়বিড় করে বলেন — না, আজই ফোনটা বদলাতে হবে। কথাটা জগু শুনে ফেলে। দোক্তা খাওয়া দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসে। বাবা, আমাকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ? ভাল, ভাল। পকেটে তোমার মাল আছে, এদিকে আমার পকেটে তো … যাক্‌ গে।

রমেশ বাবু রাস্তায় নেমে এসে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ান। জগু অল্প পিছনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যায় ২০৪ নং বাস। তেমন ভীড় নেই। রমেশ বাবু সহজেই জায়গা পেয়ে যান। জগু বাসে উঠে রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, অন্যদিকে মুখ করে। রমেশ বাবুর চোখে না পড়াই ভাল আজ। সাধারণত উনি গোল পার্কে নামেন। কিন্তু আজ নামলেন গড়িয়াহাটের একটা স্টপ আগে। জগু ভাবে — এটা কেমন হল? আগেই নেমে গিয়ে কোথায় যাবে লোকটা? জানতে তো হবেই। তাই সেও নেমে যায়। একটা গাছের পিছনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করে রমেশ বাবু কোথায় যাচ্ছেন। রাস্তা পার হয়ে রমেশ বাবু সোজা গিয়ে ঢুকলেন স্টেট ব্যাঙ্কের এ টি এম ঘরটিতে। জগু তো আহ্লাদে প্রায় নাচতেই শুরু করে। এ টি এমে অনেক লোক, তাই অপেক্ষা করতে হয় কিছুক্ষণ। মিনিট পনের পরে রমেশ বাবু এদিক ওদিক চাইতে চাইতে বেরিয়ে আসেন। জগুকে আবারও লুকোতে হয় একটা গাড়ির পিছনে। তারপর ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে রমেশ বাবু হাঁটা দেন গোল পার্কের দিকে। ওখানে একটা ভাল মোবাইল ফোনের দোকান আছে। খুশি মনে সেইদিকে চলেন তিনি। পিছনে জগু।

গড়িয়াহাটের মোড়ে বিরাট ভীড়। ধাক্কাধাক্কি করে রাস্তা পেরোতে হয়। রমেশ বাবু একবার এগোন, একবার পিছিয়ে আসেন। মহা সমস্যা। গাড়িগুলো এমন জোরে চলে যে ভয়ে পিছিয়ে আসতে হয় বার বার। এদিকে জগুও এখন ঠিক রমেশ বাবুর পিছনেই। সেও এগোয় পেছোয়। ডান হাতটা সন্তর্পনে রমেশ বাবুর ডান পকেটে দু আঙুল ঢুকে যায়। অদৃশ্য নোটগুলো আর এক সেকেন্ড পরেই তার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। এমন সময় ক্রিং ক্রিং ক্রিং শব্দে রমেশ বাবুর ফোন আর্তনাদ করে ওঠে। প্রথমটা রমেশ বাবু ফোনটা ধরছেলেনই না। এদিকে ফোন ধরতে গিয়ে যদি রমেশ বাবু হঠাৎ পিছন ফিরে তাকান এই ভয়ে জগুও ডান হাতটা গুটিয়ে একটু অন্যদিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু ফোন কিছুতেই থামে না। শেষে বিরক্ত হয়ে রমেশ বাবু বাঁ পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে লাগিয়ে বলেন — হ্যালো, হ্যালো।

ওদিক থেকে কে একজন বলে ওঠে — হ্যাঁ বলুন।

রমেশ বাবু তো অবাক।

— কী বলব? আপনিই তো আমাকে ফোন করলেন।

— সে তো আপনার মিস্‌ড্‌ কল দেখে।

— মিস্‌ড্‌ কল? আরে আমি তো কাউকে ফোনই করি নি। আপনি কে?

— আমি গড়িয়াহাট থানা থেকে বলছি। আপনি ১০০ ডায়াল করেছিলেন। এমার্জেন্সি নম্বর।

— থানা থেকে বলছেন। সে কী? এমার্জেন্সি? কীসের এমার্জেন্সি?

রমেশ বাবু এবার ঘাবড়ে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করেন। পিছনেও ফিরে তাকান। দেখেন জগু দাঁড়িয়ে।

— এ কী? তুই এখানে কী করছিস? তুই তো সালকিয়াতে থাকিস।

জগু থতমত খেয়ে যায়।

— হ্যাঁ স্যার। কিন্তু আজ একটু এদিকে কাজ আছে। হালতুতে আমার শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরের হার্টের ব্যামো। একটু বাড়াবাড়ির দিকে।

— ও, তাহলে গোলপার্কে যাচ্ছিস কেন? হালতু তো কসবার দিকে।

— হ্যাঁ তাই যাচ্ছিলাম। ভীড়ে আটকে … তাছাড়া এদিকে রাস্তাও ভাল চিনি নে।

রমেশ বাবুর যে থানা থেকে ফোন এসেছিল সেটা জগু শুনতে পেয়ে গেছে। পুলিশরা পকেটমারদের তেমন ভালবাসে না। রমেশ বাবু ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ফোনটা কানে লাগান।

— দেখুন আমি তো কোনো এমার্জেন্সি দেখতে পাচ্ছি না। বোধহয় আমার ফোনটায় কিছু গণ্ডগোল আছে। মাঝে মাঝেই বেজে ওঠে। অকারণেই। তবে থানা পুলিশ হয় নি এর আগে।

ওদিকের লোকটা ততক্ষণে ফোন ছেড়ে দিয়েছে। রমেশ বাবু হতভম্বের মত ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে আবার পিছনে তাকালেন। জগু অদৃশ্য। রমেশ বাবু জানেনই না যে তাঁর ফোনের গুণে টাকাগুলো বেঁচে গেল।

রাস্তা পার হয়ে আবার গোল পার্কের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। গাঙ্গুরামের দোকানের সামনে ফোনটা আবার বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে ফোন ধরলেন। এবার শুনলেন একটি অতি পরিচিত মহিলা কণ্ঠ। গৃহিণী।

— মাইনে পেয়েছ?

— ওটা ছাড়া কি আর কিছু বোঝ তুমি? হ্যাঁ পেয়েছি।

— শোন, এ মাসে একটু বেশি খরচা আছে। করবীর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ভাল কিছু দিতে হবে।

— আরে আমারও তো কিছু কেনার আছে। ফোনটা কাজ করছে না। বদলাতেই হবে। যেখান সেখান থেকে ফোন আসে। আজ পুলিশ ফোন করেছিল।

— পুলিশ? কেন? তুমি কি উলটো পালটা কাজ করছ নাকি?

— ধ্যাৎ!

— না, না, শোন। ফোন ও মাসে কিনো। এ মাসে ওটা দিয়েই চালিয়ে দাও।

— আরে কেমন করে চালাব? ওটা চলে না। করবীর বিয়েতে ফুল টুল কিছু দিয়ে দিও।

— আশ্চর্য আবদার তো? করবী কে সেটা কি তুমি …। ফোন কেটে গেল।

রমেশ বাবু লক্ষ্য করলেন ফোনটা কেমন যেন গরম হয়ে উঠেছে। কিছু গণ্ডগোল নিশ্চয়ই আছে। এ ফোন এক্ষুণি বদলানো দরকার। উনি গৃহিণীর বারণ স্বত্বেও হাঁটা দিলেন ফোনের দোকানের দিকে। ঠিক আছে, নাহয় একটু অল্প দামের ফোনই কিনবেন। কিন্তু এটাতে কী যেন আছে। বিদেয় করা দরকার। দোকানের সিঁড়ির কাছে পৌঁছেছেন, হেনকালে আবার ক্রিং ক্রিং …।

— হ্যালো …

— বাবু, আমি শ্যামার বর কথা বলছি।

— শ্যামা? সে আবার কে?

— আরে আপনার বাড়িতে কাজ করে, চিনতে পারছেন না?

— ও হ্যাঁ হ্যাঁ … কী চাই। হঠাৎ আমাকে ফোন করছ কেন?

— বাবু, আমার ছোট মেয়েটার খুব জ্বর। কালকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। শ্যামা কাজে যেতে পারবে না।

— ও! তাই বুঝি। এ কথা তো আমার বাড়ির লোককে জানাতে পারতে। আমাকে কেন? তাছাড়া তুমি ফোন করছ কেন? শ্যামা করতে পারে না?

— বাবু আপনারা তো এই নম্বরটাই দিয়েছিলেন। আর শ্যামা কেমন করে ফোন করবে? ওর কি ফোন আছে? আমরা গরিব মানুষ — নুন আনতে পানতা ফুরায় …

— ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি বাড়িতে বলে দেব। মেয়েটা কেমন থাকে জানিও।

রমেশ বাবুর মনের সব দ্বিধা কেটে গেছে। মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের মত কর্মচারিণী শ্যামার মুখটা ভাসতে থাকে। না পুরনো ফোনটা এক্সচেঞ্জ করবেন না। ভাল হোক, খারাপ হোক, ওটা শ্যামাকেই দিয়ে দেবেন। মাঝে মাঝে তো কাজ করে ওটা। ওর কাজে লাগতে পারে।

রমেশ বাবু দোকানে ঢুকে পড়েন।

Endless — Haiku

why? I wish I knew–

endlessly waited for you–

deserted seashore…

কবি

জোনাকির ঝিলিমিলি আলো
কে বা জানে কবিদের
কেন লাগে ভাল !!
জোনাকিরা করে আলোকিত
রাতদুপুরেতে যদি
উড়ে উড়ে কারও পশ্চাতো,
“কী বা সুখ পাবে সেই জনে?”
জবাব এ প্রশ্নের
আসছে না কিছুতেই মনে।

Wary

near burning ground,

vultures flap wings in their nests —

camera wary …

Promise — Haiku


drenched in rain I wait,

unable to find shelter —

don’t fail, she had said …

Vowel Correct


To live,

I believe,

is not a great idea,

when it is time …

to leave.

মধ্য লয়


বিকালে তাদেরই বেসেছি গভীর ভাল
সুদূর প্রভাতে আসে নি হেথায় যারা …
সুদূর প্রভাতে যাদেরই বেসেছি ভাল
বিকালে কোথায় হারিয়ে গেল যে তারা …

উপলব্ধি


হারিয়ে গেল কোন অজানায়
বন্ধুগুলোর বিন্ নোটিসের হল্লা
তার বদলে বংশধরেরা
জাঁকিয়ে যেদিন ভরল এ মহল্লা
সেদিন থেকেই বুকটা কেমন
করছে দুরু দুরু —
বার্ধক্যের শুরু …
________
Inspired by an Ogden Nash idea, but style wise different.

বুড়োরা


বুড়োদের মরা ছাড়া নেই আর কোনও কাজ
মনে হয় এরকমই সকলের আন্দাজ
আন্দাজে গলদ আছে অন্তত শ’ আড়াই
বুড়োরা মরছে কীনা বোঝে একা বুড়োরাই।
_____________
Inspired by an Ogden Nash idea, though stylistically different.

Finding the Real

https://epaper.telegraphindia.com//epaperimages//26072019//26072019-MD-HR-12.PDF