A KALEIDOSCOPE WORLD

পার্সোনালিটি – ফোনুগল্প (অণুগল্প ৫)

আমাকে কেউ ফোন টোন করে না। তাই আমিও করি না। কিন্তু মাসের শেষে ফোনের বিল দিই। কেন কে জানে? বিমর্ষ লাগে। মাঝে মধ্যে অবশ্য ফোন বেজে উঠে হর্ষ জাগায়। আমি উৎসাহে লাফিয়ে উঠি।

–হ্যালোওওও।

অপর দিক থেকে পুরুষ বা নারী কণ্ঠ শোনা যায়।

— কে কানাই ড্রাইভার? কাল আসবি বলে এলি না কেন?

বুঝি এ ফোন আমার নয়। তবু জবাব দিই।

–মিথ্যে কথা বলেছিলাম। তুই বরং চলে আয়।

কণ্ঠস্বর চমকে ওঠে।

–মাল খেয়েছিস নাকি বেটা? সাহস তো কম না। তুই বলছিস!

আমি ফোন রেখে দিই।

আরেক জাতীয় ফোন আসে। নারী কণ্ঠ। আজই এসেছিল। সে আর হ্যালো বলল না।

–মিস্টার দীপংকর? আমি এয়ারটেল থেকে বলছি। আপনার জন্য একটা দারুণ অফার আছে মিস্টার দীপংকর।

এই মিস্টার দীপংকর সম্বোধনটার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। উত্তর ভারতে অনেকে মিস্টার গুপ্তা বলতেন। তাঁরা ভাবতেন ভগবানদাসের মত আমার নাম দীপংকরদাস আর পদবী গুপ্তা। বহু বুঝিয়েও তাদের দাশগুপ্ত ব্যাপারটা বোঝাতে পারি নি। কিন্তু মিস্টার দীপংকরটা নতুন ঠেকল।

–তাই বুঝি? কী অফার, আরেকটা সিম কার্ড?

— না, না, মিস্টার দীপংকর। আপনি আমাদের অনেকদিনের কাস্টোমার, তাই আপনাকে একদম ফ্রি-তে একটা স্পেশাল অফার দেওয়া হচ্ছে।

–তাই? একটু খোলসা করে বলবেন?

–অবশ্যই বুঝিয়ে দেব মিস্টার দীপংকর। এটা থাকলে আপনাকে যে ফোন করবে সে কোনও ক্রিং ক্রিং শুনবে না।

আঁতকে উঠলাম।

–সে কী? কিছু না শুনলে তো মুশকিল হবে। অবশ্য কানাই ড্রাইভারের খোঁজ করলে অন্য কথা।
–কী বললেন মিস্টার দীপংকর? কানাই? আপনি মিস্টার কানাই?

–না না, আমি কানাই না। সে অন্য লোক।

নারী কণ্ঠে খুশি উপচে পড়ে।

–মিস্টার দীপংকর, এই অফার নিলে যিনি আপনাকে ফোন করবেন তিনি শুনবেন “হ্যালো, আমি মিস্টার দীপংকর বলছি”! আর সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এটা আপনি যেকোনো ভাষায় শোনাতে পারবেন। কেবল বছরে একবার মাত্র ৩০০ টাকা দিতে হবে।

বিনা মূল্যের মূল্য ৩০০ টাকা।

তবু একটু ভাবলাম। আইডিয়াটা মন্দ নয়। কানাই ড্রাইভারের হয়ে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। তবে সে লোকটাকে এত শত কথা বলব কেন? জানতে চাইলাম।

–এমন হলে আমার সুবিধা কী?

–মিস্টার দীপংকর, কলারের কাছে আপনার পার্সোনালিটি দারুণ বেড়ে যাবে।

মেয়েটির গলায় উত্তেজনা।

–সে কী? আমার ফোন এই অদ্ভুত উপায়ে আমার পার্সোনালিটি বাড়িয়ে দেবে?

–হ্যাঁ মিস্টার দীপংকর, যে শুনবে সেই ইম্‌প্রেস্‌ড হবে।

–তাই নাকি? আচ্ছা আপনি নিজে একবার শুনে দেখুন তো। আমি মিস্টার দীপংকর বলছি। আপনি কি ইম্‌প্রেস্‌ড হয়ে গেলেন এটা শুনে?

–না, মানে আমি তো এয়ারটেল থেকে বলছি।

–না? আপনি না বললেন? ইম্‌প্রেস্‌ড হলেন না?

–না। মানে হ্যাঁ, মানে ঐ আর কী! আসলে আমি তো কোম্পানি থেকে বলছি।

–তাই তো জিজ্ঞেস করছি। আপনি ইম্‌প্রেস্‌ড হয়েছেন কি? এটা জানা খুব জরুরি। এয়ারটেল ছাড়া আর কেউই প্রায় আমাকে ফোন করে না। এয়ারটেল নিজেই ইম্‌প্রেস্‌ড না হলে ৩০০ টাকা দেব কেন?

–মিস্টার দীপংকর! এয়ারটেল তো কোম্পানি।

–আর আপনি? আপনি কী? মানুষ না কোম্পানি? আমি জানতে চাই আপনি আমার পার্সোনালিটির ব্যাপারে ইম্‌প্রেস্‌ড হয়েছেন না হন নি। আমি মিস্টার দীপংকর বলছি।

বেচারা মেয়েটা, দু-চারটে পার্টি ধরে দিতে পারলে কমিশন পাবে। একটু কষ্টই হল।

–দেখুন, আমি যাকে বলে বেশ পাঁচু টাইপের একটা লোক। পাঁচুর ঐ পা-টুকুতেই পার্সোনালিটির সঙ্গে মিল। আমার মনে হয় আপনিও আমারই মত একটা লোক। তবে আমার পার্সোনালিটি বিহীন জীবনের আর অল্পই বাকি আছে। আপনাকে কিন্তু এখনও অনেক বছর এয়ারটেলওয়ালাদের দুর্দান্ত সব অফার নিয়ে মিস্টার দীপংকরদের পিছনে ছুটতে হতে পারে। আপনাকে কেউ ফোন টোন করে? আমাকে করে না, আপনার মত ভুল না করলে।

%d bloggers like this: