সবুজ শাড়ি — অণুগল্প ৭


ভদ্রমহিলা বারবার বলছেন – আমি যাব, আমি যাব।

ব্যাঙ্কে পাসবুক আপ-টু-ডেট করার মেশিনের লম্বা লাইনের পাশটিতে দাঁড়িয়ে। এক ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন – লাইনে দাঁড়ান। দেখছেন না লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সবাই।

শুনেও মহিলা বললেন – আমি যাব, আমি যাব।

আমি লাইনেই দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে। ফলে তখন প্রায় মেশিনের ধরা ছোঁওয়ার মধ্যে এসে গিয়েছি। আমার আগের ভদ্রলোকের কাজ শেষ হয়ে যেতেই আমার পালা এল।

এদিকে আবারও সেই আমি যাব, আমি যাব।

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে মহিলাকে দেখলাম। বয়স্কা। জিজ্ঞেস করলাম – আপনি কি আমার আগে যেতে চাইছেন?

এক গাল হেসে উনি মাথা দুলিয়ে জানালেন তেমনটাই তাঁর ইচ্ছে।

তারপর বললেন – অনেক বয়েস তো, দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। কষ্ট হয়।

আমি বললাম – ঠিক আছে আপনিই আগে চলে আসুন। আমার বয়েস কিন্তু আপনার সমান বা তার চেয়েও বেশি।

অসীম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উনি বললেন – ধ্যুৎ! আমি অনেক বড়।

আমি আবারও বললাম – হতেই পারে না।

উনি বললেন – কেন পারে না? আমার বয়েস ৮৮।

একটু চমকে উঠলাম। ঠিকই বলেছেন। বেশ খানিকটা বড়। ওনার শাড়ির রঙটা সবুজ। তাই হয়তো ভুল করলাম। এক জ্যোতিষি বলেছিল অতদিন আমি নাকি বাঁচবই না। এইসব ভাবছি, এমন সময় মহিলা বললেন – আমি তো এইসব মেশিন দিয়ে কিছু করতেই পারি না। আপনি করে দিন। বলে পাসবুকটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন নিশ্চিন্তে।

কী মুশকিল। কেন যে পরোপকার করতে গেলাম? সবুজ শাড়িটা যত অনর্থের মূল। ওনার পাসবুক যন্ত্রস্থ করে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেশিন নিজের মনে কী সব গজগজ করে হঠাৎ খাতাটা উগরে বের করে দিল। মহিলা আমার কর্মক্ষমতার উপর পরম বিশ্বাসে তখনও সবুজ শাড়িতে শোভা পাচ্ছেন। এদিকে আমি দেখি মেশিন লিখিত ভাবে ঘোষণা করছে – বার-কোড মিলছে না। আপ-ডেট করা সম্ভব না।

খাতাটা বের করে উলটে পালটে দেখলাম বার-কোড লাগানোই নেই।

বললাম – এ কী? বার-কোড লাগানো নেই তো। তাহলে যন্ত্র তো আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করবে না।

সবুজ শাড়ি বললেন – তাই? বার-কোড কী? একদম অসহায় চাহনি। মনটা খারাপ লাগল। ওনার হয়ে এই কাজটা করার জন্য ছেলে মেয়ে জাতীয় কেউ নেই নিশ্চয়ই। হয়তো ছিল, মরে গিয়েছে। মানে হয়তো আমেরিকাতে থাকে। কিংবা অস্ট্রেলিয়া। কিংবা ফিনল্যান্ড।

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম ওনার ছেলেপুলেরা মরে গিয়েছে কীনা। করলাম না। তার বদলে আঙুল দেখিয়ে বললাম – দেখুন তো, ঐ কাউন্টারটায় বোধহয় ওরা বার-কোড লাগিয়ে দেবে। নিজের পাসবুকটাও ওনাকে দেখালাম, বার-কোড কাকে বলে চেনাবার জন্য। ওনার মৃত ছেলে মেয়েরা এই কাজটা করে যায় নি মনে হল। উনি আর কিছু বললেন না। আস্তে আস্তে কাউন্টারের খোঁজে চলে গেলেন।

একটু অপরাধ বোধ যে হল তা স্বীকার করতেই হয়। আমিও তো সঙ্গে যেতে পারতাম। কিন্তু এও ভাবলাম — কত সন্তানহারাকে বার-কোড বোঝাব?

স্বার্থপরের মত নিজের কাজটুকু করে বেরিয়ে এলাম। নিজের কাজ তো হল, কিন্তু মনটা কেবল খোঁচা মারছে। ওনার ছেলে মেয়ে তো সেই কবেই চলে গিয়েছে। হয়তো ওদের শেষ দেখেছেন ১৯ বছর আগে। এয়ারপোর্টে বাই বাই করার সময়। কেমন দেখতে তাই কি আর মনে করতে পারবেন?

কী যে করি! সারাক্ষণ কানে বাজছে — আমি যাব, আমি যাব।

পরণে সবুজ শাড়ি, বয়েস ৮৮।

Advertisements
Post a comment or leave a trackback: Trackback URL.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s